বাঙালির জাতীয় জীবনে ঐতিহাসিক এক মহান অর্জন ‘বিজয়’। যে বিজয় এসেছে একটি সশস্ত্র যুদ্ধের পর, ৩০ লাখ শহিদের রক্ত আর ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে। সেই মহালগনের ৪৯তম বার্ষিকী পার করে ৫০-এর সুবর্ণবর্ষে পা দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী একটি গর্বিত জাতি। তবে অসত্য নয় যে, গত হওয়া ৪৯ বছরের বেশির ভাগ সময়ই পুরো জাতি হেঁটেছে উলটো পথে বিজয়ের মূলগাথা ভুলে।
জাতির পিতার নৃশংস হত্যাযজ্ঞের পরই, হত্যায় প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত বকধার্মিক ঘাতকরা স্বার্থান্বেষী মোসাহেবদের নিয়ে কখনো আসকান পরে, কখনো সাফারি-সুট কালো চশমা সহযোগে নানা ধরণের বুলি আওড়িয়ে, কখনো ধর্মের ধুয়া দিয়ে ৫০ বছরের মধ্যে প্রায় ৩০ বছরই উলটো গতির এ রাজেন্যবর্গই মসনদ দখল করে তাদের মহাযজ্ঞ চালিয়েছেন। ওদের বিবেক কি একবারও প্রশ্ন করেনি—কোন লক্ষ্যে এক সত্যদর্শী ঋষি, ধ্যানী তাপসের মগ্নতায় সুদীর্ঘ ২৩ বছর আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে একটি অশিক্ষিত, অর্ধচেতন, ধর্মভীরু জনগোষ্ঠীকে ৭১-এর ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে স্বাধীনতার জাগ্রত সিঁড়িতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন? এত রক্ত, এত ত্যাগ কি শুধু গদি দখলের জন্য? এ শ্যামল বদ্বীপের সরল মানুষগুলোর ঘরে স্বাধীনতার সোনালি সুফল পৌঁছে দেওয়ার জন্য তার কি সুনির্দিষ্ট সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য ছিল না? বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে নবরূপে গড়ে, যত দ্রুত সম্ভব এ বঞ্চিত দুখী মানুষদের মুখে অনাবিল হাসি অবলোকনের অসীম কাতরতা, অন্তহীন তৃষ্ণা তার কি ছিল না? তার কর্মোদ্যোগ পরিকল্পনা সাক্ষ্য দেয়, অবশ্যই ছিল।
জাতির পিতা তার অতিপ্রিয় আপামর মানুষদের মাত্র তিন বছর ধৈর্য ধরতে বলেছিলেন। জানতেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের মাধ্যমে তার কাঙ্ক্ষিত গতিশীলতায় নিয়ে আসার জন্য এ অত্যন্ত স্বল্প সময়। তবু তাকে পারতেই হবে, ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ নেই। তার ভালোবাসায় দুখী মানুষদের মুখে হাসি ফোটানোই যে তার জীবন-আরোধ্য। পেরেছেনও অকল্পনীয় দ্রুততায় অগ্রসর হতে। ’৭৫-এর জুন মাস থেকে যখন অর্থনীতির সূচকগুলি ক্রমশ ঊর্ধ্বগামী, দ্বারপ্রান্তে বাম্পার ফলনের আগাম সুবাস, ঠিক সে সময়ই ঘাপটি মারা ছদ্মবেশী ঘাতকরা মধ্যরাতে স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হয়। ঘাতকদের পরিকল্পনা মুহূর্তের নয়। বহুদিনের গোপন ষড়যন্ত্র সলাপরামর্শের পর। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে স্বাধীন ভূখণ্ডে জন্ম নেয়া নতুন দল ‘জাসদে’রই তত্পরতা ছিল উল্লেখযোগ্য। ৭৩, ৭৪, ৭৫-এর স্পেশাল অর্ডিন্যাস জারির পূর্ব পর্যন্ত প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মধারায় এদেরই ছিল রাজপথে তুখোড় ও সাহসী বিচরণ। কলেজ-বিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলির সিংহভাগই ছিল এদের ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্ব-আওতায়। ১৫ আগস্টের কালো অধ্যায়ে এদের ভূমিকা নেই সত্য, কিন্তু আওয়ামীবিরোধী জনমত গড়ে তুলতে এদের প্রতিবাদ, আন্দোলন, সংগ্রাম সহায়ক ছিল। পাশাপাশি ছিল ছদ্মবেশী পাকিপ্রেমী, স্বাধীনতাবিরোধীদের সীমাহীন প্রপাগান্ডা। শেখ কামালের ব্যাংক ডাকাতি, ভারতের অধীনতা মেনে অচিরেই বঙ্গবন্ধুর মাথায় করদ রাজার রাজমুকুট শোভা পাবে, প্রভৃতি আজবগুজব ডালপালা মেলে ছড়াতে থাকে কিন্তু ১৫ আগস্টের পর থেকে ক্ষমতার রাজনীতির স্রোত ও চরিত্র প্রাসাদের ভেতরে এবং বাহিরে এতটাই জটিল সমীকরণে টালমাটাল ও অতি দ্রুত রং পালটাচ্ছিল যে, সেসব কুচক্র চালের কারসাজির সঙ্গে জাসদের কসরত মার খেয়েছে। মাঝখানে বলি হয়েছে কর্নেল তাহের বীর-উত্তমসহ বিস্তর সাহসী অমূল্য প্রাণ। মূল ফোকাসে চলে আসে ৩৯ বছর বয়সি মে. জে. উচ্চাভিলাষী কপটপটু ঠান্ডা মাথার হননবিদ জিয়া। তার নেপথ্য স্যাঙাত ফারুক-রশিদের সাক্ষ্যে (সাক্ষাত্কার স্যাটারডে পোস্ট) ‘জিয়া ছিলেন একজন পাকা খেলোয়াড়, চিফ অব আর্মি স্টাফের পদবির অপব্যবহার করে জিয়া সর্বদাই মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জনগণ ও সৈনিকদের ধোঁকা দিয়েছেন।’
কুঠারে স্পর্শ না দিয়েও শুধু কূটবুদ্ধি দিয়ে বিশাল বিশাল মহিজাত বৃক্ষ নিধনে, যে সিদ্ধিলাভ করেছে, ফোকাসে এসে মসনদে বসার বাকি পথের আগাছা পরগাছা ড্রিবলিং কেরামতিতেই কুপোকাত। ক্ষমতায় আরোহণ করেই বিনাশ্রমে পেয়ে গেলেন প্রস্তুত হয়ে থাকা পাকিপ্রেমী, জিন্দাবাদপ্রেমী অগুনতি মোসাহেব গোষ্ঠী।
রাজধানী থেকে সুদূর মফস্সল হবিগঞ্জের বৈদ্যের বাজারে শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যা আর খোদ রাজধানীর উপকণ্ঠে শেখ হাসিনাকে টার্গেট করে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিন্যুর সমাবেশে গ্রেনেড হামলা ও হত্যাযজ্ঞ একই সুতোয় গ্রথিত। এদের শক্তির উত্স, আশ্রয়-প্রশ্রয়স্থল সাফসুতরো হাবার জল সবকিছুই অভিন্ন ভান্ডারের সরবরাহ। সে ভান্ডার হলো পরিষ্কার চিহ্নিত গোষ্ঠীর ক্ষমতা ও অর্থ। গত ১২ বছরে মুজিবকন্যার নেতৃত্বাধীন সরকার অপশক্তিকে কিছুটা শক্তিহীন এবং চিন্তাগ্রস্ত করেছে সত্য, কিন্তু কোণঠাসা শক্তিহীন করতে পারেনি। গভীরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, সোশ্যাল মিডিয়ার স্ক্রিনে টাচ দিলেই মিলে যাবে অগুনতি নতুন বেড়ে ওঠা বেড়াল-তপস্বী সাম্প্রদায়িক চেতনার তালেবে এলেমের দল। শুধু রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহার করে এ অপশক্তিকে নিবীর্য করা যাবে না কখনো। শুদ্ধ ইতিহাস ধারণ করা, স্বাধীনতার সপক্ষের সব শক্তিকে ঐক্যের সুদৃঢ় রজ্জুতে গ্রথিত করতে না পারলে এ বড় দুঃসাধ্য। আমাদের জন্ম-ইতিহাস নিয়ে সত্য ও অসত্যের যে দ্বন্দ্ব তাকে আরো তীব্র করতে হবে। মিথ্যা আর অপরাজনীতির বিরুদ্ধে সকল প্রগতিশীল ব্যক্তি ও দলকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে, নিবেদিতপ্রাণ প্রতিশ্রুতিশীল সত্, সত্যসচেতন ছাত্র-যুবশক্তিকে সংগঠিত করে জনজাগরণের ভূমি নির্মাণ করতে হবে। সামাজিক প্রতিরোধের সত্যস্বরকে চারদিকে ছড়িয়ে দিতে হবে। এই গণজাগৃতিকে দীর্ঘ সময় দীপিত রেখে সত্য ও মিথ্যার বিভাজনকে সুস্পষ্ট করে সত্যের রাজনীতিকে এদেশের মৃত্তিকার গভীরে প্রোথিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে এ বিভাজন হিংসা বা প্রতিহিংসার নয়, এ বিভাজন ‘সুস্পষ্ট স্বীকৃত সত্য ন্যায় ও ন্যায্যতা’ প্রতিষ্ঠার জন্য। তবেই বিজয়ের মূল গাথায় পুরো জাতিকে গ্রথিত করে সতদর্শী জনকের দৃষ্টিরেখায় অঙ্কিত সুবর্ণ দিশা ধরে—এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
n লেখক :প্রকৌশলী ও কথাশিল্পী
