পলাতক ও দণ্ডিতদের বক্তব্য মিডিয়ায় প্রচারে নিষেধাজ্ঞা

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০২০, ২২:৫১

পরোয়ানাভুক্ত পলাতক ও দণ্ডিত আসামিদের বক্তব্য গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে হাইকোর্ট। দুদকের এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল বুধবার এই আদেশ দেয়। একই সঙ্গে বেসরকারি চ্যানেল একাত্তর টিভিতে অর্থ পাচারে জড়িত প্রশান্ত কুমার হালদারের (পি কে) বক্তব্য প্রচারের ভিডিও ক্লিপ তলব করেছে আদালত। আগামী ১০ জানুয়ারি হাইকোর্টের রেজিস্ট্রারের কাছে ঐ ভিডিও ক্লিপ দাখিল করতে একাত্তর টিভি কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আদালত বলেছে, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বাক্স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সেই বাক্স্বাধীনতার বিষয়টি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপেক্ষে হতে হবে। তাই বাক্স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচার বক্তব্যের (ফ্রি-স্টাইল স্পিচ) অনুমোদন দিতে পারি না। সেজন্য আইনের দৃষ্টিতে যিনি পলাতক এবং দণ্ডিত ব্যক্তি তার কোনো ধরনের বক্তব্য ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবে প্রচারের সুযোগ নেই। এসব ব্যক্তির বক্তব্য প্রচার বা প্রকাশ করা হলে বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ কারণে পি কে হালদারসহ এ ধরনের পলাতক ও দণ্ডিত ব্যক্তিদের বক্তব্য প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলো।

আদালত বলে, হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পি কে হালদারের বিরুদ্ধে দুদক ও মানি লন্ডারিং আইনে মামলা হয়েছে। এসব মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন ঢাকার সিনিয়র স্পেশাল জজ। সেই পরোয়ানার আদেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলে পাঠানো হয়েছে। আইনের দৃষ্টিতে পলাতক আসামি পি কে হালদারের বক্তব্য একাত্তর টিভিতে প্রচার করা হয়। কিন্তু দণ্ডিত ও পলাতক আসামির বক্তব্য প্রচারের ক্ষেত্রে ২০১৫ সালে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

গত ২৮ ডিসেম্বর একাত্তর টিভির ১০টার সংবাদে এবং সাড়ে ১১টায় ‘একাত্তর জার্নাল’ নামের টকশোতে অতিথি হিসেবে সরাসরি অংশ নেন পি কে হালদার। ঐ টকশোতে দুদক কৌঁসুলি খুরশীদ আলম খানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু যখন জানতে পারেন পি কে হালদারকে অনুষ্ঠানে অতিথি করা হয়েছে তখন তিনি ভার্চুয়ালি টকশো থেকে বের হয়ে যান। পলাতক আসামি পি কে হালদারের বক্তব্য টিভি মিডিয়ায় প্রচারের সুযোগ নেই উল্লেখ করে হাইকোর্টে আবেদন দেয় দুদক। একই সঙ্গে একাত্তর টিভির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করা হয়।

শুনানিতে দুদক কৌঁসুলি খুরশীদ আলম খান বলেন, আমরা গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। কিন্তু তার মানে এই নয় যে একজন পলাতক আসামিকে মিডিয়ায় কথা বলার সুযোগ দিয়ে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিরুদ্ধে সাফাই গাওয়ার সুযোগ করে দেবে। একাত্তর টিভিতে পি কে হালদারের প্রচারিত বক্তব্যটা দেখলেই বোঝা যায় এটা পূর্বপরিকল্পিত। টিভির লাইসেন্স পেয়ে যা ইচ্ছা তাই করার সুযোগ নেই। একাত্তর টিভি কি দেশের কোনো আদালত? কোনো প্যারালাল কোর্ট? তাহলে কেন আসামির বক্তব্য প্রচার করল? এতে বিচার বিভাগ সম্পর্কে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। এ পর্যায়ে আদালত বলে, পলাতক ব্যক্তির বক্তব্য প্রচারে আইনে নিষেধাজ্ঞা আছে কি?

দুদক কৌঁসুলি বলেন, ২০১৫ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে হাইকোর্ট। সেই আদেশ এখনো বহাল আছে। ঐ মামলায় শুধু তারেক রহমান নয় পলাতক কোনো আসামির বক্তব্য প্রচার করা যাবে না বলে আদেশ রয়েছে। এরা হলুদ সাংবাদিকতা করেছে।

রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিনউদ্দিন মানিক বলেন, প্রবাদ আছে ‘চোরের মায়ের বড় গলা’। হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করে এখন বিদেশে পলাতক থেকে মিডিয়ায় বক্তব্য দিচ্ছে পি কে হালদার। একাত্তর জার্নালের উপস্থাপিকা একজনের মন্তব্যের জবাবে বলছেন, পি কে হালদার অভিযুক্ত, দণ্ডিত নয়। অভিযুক্ত হলে বক্তব্য প্রচার করা যাবে এটা উপস্থাপিকা কোথায় পেল? এই টকশোতে তাকে এনে ঐ টিভি চ্যানেল রাষ্ট্রযন্ত্র ও বিচার ব্যবস্থাকে হেয় করেছে। উভয় পক্ষের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট পলাতক ও দণ্ডিত আসামির বক্তব্য প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়।