উখিয়ায় বনাঞ্চলের গাছ কেটে জ্বালানি

ইটভাটায় পুড়ছে পাহাড় ও ফসলি জমির মাটি

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২১, ০২:৪৩

উখিয়ার বিভিন্ন স্থানে ও তত্সংলগ্ন নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমে অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছে ইটভাটা। বনভূমির পাহাড় ও ফসলি জমির মাটি পুড়ে তৈরি করা হচ্ছে ইট। জ্বালানি হিসেবে জোগান দেওয়া হচ্ছে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মূল্যবান গাছগাছালি। গত ২০ বছর ধরে ঐ ইটভাটার আশেপাশে নির্বিচারে বন জঙ্গল লুটপাট, পাহাড় কর্তণসহ নানাবিদ তাণ্ডবে বনভূমি লন্ডভন্ড হয়ে গেলেও দেখার কেউ নেই। ইটভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় আক্রান্ত এলাকাবাসী প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দেওয়ার পরও বহাল তবিয়তে চালিয়ে যাচ্ছে অবৈধ ইট তৈরির কার্যক্রম। গ্রামবাসীর অভিযোগ প্রভাবশালী চক্রের হাতে বনবিভাগের দুর্নীতিপরায়ন কর্তাব্যক্তিরা ম্যানেজ হওয়ার কারণে অবৈধ ইটভাটাগুলো বন্ধ হচ্ছে না।

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ইটভাটা পরিচালনার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, বিএসটিআইসহ বিভিন্ন দপ্তরের ছাড়পত্র দরকার হয়। কিন্তু উখিয়া উপজেলায় যেসব ইটভাটা গড়ে তোলা হয়েছে তার একটারও ছাড়পত্র নাই, এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। জানতে চাইলে ইটভাটা মালিক আবুল কালাম, হায়দার আলী, পলাশ বড়ুয়া জানান, তারা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরকে ম্যানেজ করে, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সহযোগিতায় ইটভাটা গড়ে তুলেছে। সরেজমিন উখিয়া সদর থেকে রওয়ানা হয়ে পাঁচ কিলোমিটার অদূরে ঘুমধুম ইউনিয়নের রেজু আমতলী এলাকায় গিয়ে দেখা যায় পাশাপাশি দুটি ইটভাটা। বোল্ডড্রোজার দিয়ে পাহাড় কেটে মাটি আহরণ করা হচ্ছে। শতশত শ্রমিক বনসম্পদ কেটে জ্বালানি তৈরি করছে। শ্রমিকদের থাকার জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে আবাসস্থল। বন সম্পদ উজাড় ও পাহাড় কেটে মাটি আহরণের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে মোল্লা নামের ইটভাটা ম্যানেজার জানান, তারা বনভূমি জায়গাটি পার্শ্ববর্তী বসবাসরত রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকজন থেকে ২০ বছরের জন্য ৭০ লাখ টাকা চুক্তি সম্পাদন করে গত বছর থেকে ইট ভাটা তৈরির কাজ শুরু করেছেন। পাশেই আরেকটি বিশাল বনভূমি এলাকায় একই অবস্থা পরিলক্ষিত হয়। এদিকে হলদিয়াপালং ইউনিয়নের মরিচ্যা পাগলির বিল, গয়ালমারা, পাতাবাড়ী, ভালুকিয়াপালং, হলদিয়াপালংসহ উখিয়ার বিভিন্নস্থানে প্রায় ১৮টি ইটভাটায় অবৈধভাবে ইট তৈরি হচ্ছে যুগ যুগ ধরে। বর্তমানে রোহিঙ্গা বসতি স্থাপনের সুযোগে এনজিওরা নতুন করে আবাসন তৈরি করার কারণে ইটের কদর বেড়েছে আগের চেয়ে দ্বিগুণ।

২০১৬ সালে তুমব্রু চাইল্যাতলী এলাকায় অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠিত ইসহাক সওদাগরের মালিকানাধীন ইটভাটায় জ্বালানির যোগান দিতে গিয়ে দুই জন রোহিঙ্গা শিশু ঘটনাস্থলে মারা যায়। খবর পেয়ে তত্কালীন নাইক্ষ্যংছড়ি নির্বাহী কর্মকর্তা উক্ত ইটভাটায় অভিযান চালিয়ে ইট ও ইট তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করে ইটভাটা সিলগালা করে দেন। চলতি বছরে ওইইট ভাটায় গিয়ে দেখা যায়, পুরোদমে ইট তৈরির কাজ চলছে। এছাড়াও বড়বিল এলাকায় দেলোয়ার হোসেনের মালিকানাধীন আরো একটি ইটভাটায় ইট তৈরির জন্য যোগান দেওয়া হচ্ছে পাহাড়কাটা মাটি। সেখানে মজুত রাখা হয়েছে বিপুল পরিমাণ লাকড়ি।

কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সংযুক্তা দাশ গুপ্তা জানান, সংশোধিত আইনে সংযোজিত পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নের স্বার্থে আধুনিক প্রযুক্তির ইটভাটা অর্থাত্ জিগজাগ কিলন, টানেল কিলন বা অনুরূপ উন্নততর প্রযুক্তিতে ইটভাটা স্থাপন করতে হবে। কৃষি জমি বা পাহাড় বা ঢিলা থেকে মাটি কেটে বা সংগ্রহ করে ইটের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে ইট তৈরি করার জন্য মজা পুকুর, খালবিল, নদনদী, চরাঞ্চল বা পাহাড় কেটে মাটি সংগ্রহ করা যাবে না। মাটির ব্যবহার কমানোর জন্য কমপক্ষে ৫০ শতাংশ ফাপা ইট তৈরি করতে হবে। নির্ধারিত মানমাত্রায় কয়লা ব্যবহার করতে হবে।

যেসব জায়গায় ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না সেগুলো হচ্ছে উপজেলা সদর, সরকারি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন বন, অভয়ারণ্য বাগান বা কৃষি জমি, পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা, নিষিদ্ধ এলাকার সীমা রেখা থেকে ন্যূনতম এক কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে ইটভাটা করা যাবে না। পার্বত্য জেলায় পরিবেশ উন্নয়ন কমিটির নির্ধারিত স্থান ছাড়া অন্যকোনো স্থানে ইটভাটা তৈরি সম্পূর্ণ নিষেধ রয়েছে। তিনি জানান, বান্দরবানের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ২৫টি ইটভাটা রয়েছে। যার একটিও নীতিমালায় পড়ে না।

উখিয়া সহকারী কমিশনার (ভূমি) আমিমুল এহসান খান জানান, উখিয়ার লোকালয়ে যেসব ইটভাটা গড়ে তোলা হয়েছে ঐসব ইটভাটার পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র আছে কি না, তা যাচাই করে দেখা হচ্ছে।

ইত্তেফাক/টিআর