অণুগল্প

কিছু মেঘ জমে থাকে আকাশে

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২১, ১৯:০৮

শীতের দুপুরবেলা। ঠিক দুপুরও না। বিকেলের দিকে খানিকটা হেলে পড়া দুপুর। লিন্টু ভাত খাওয়ার পর বারান্দায় হাঁটাহাঁটি শেষে টবে লাগানো কাঁটামুকুটের টকটকে লাল ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। ছোট ছোট ডালগুলোতে কাঁটা আর কাঁটা। মৃদু হাওয়ায় অপরাজিতা, হাস্নাহেনা আর পাতাবাহারের পাতা তিরতির করে কাঁপছে।

শীতের এই দুপুরশেষের সময়ে মিষ্টি রোদের ছোঁয়া মনকে কেমন যেন উচাটন করে দেয়। খানিকটা বোধহয় উন্মনাও করে তোলে। বুকের ভেতর পাতা ঝরে যাওয়ার সময় বনের ভেতর যেমন হাওয়ারা হাহাকার করে বেড়ায়, তেমনি এক অনুভব জাগে।

পশ্চিম আকাশ থেকে সূর্যের আলো উঁচু উঁচু ভবনের মাথায় আটকে যাওয়ায় পেছনের একতলা দোতলা বাড়িগুলোতে ছায়া পড়ে। তারপরও দু’একটু ফাঁক-ফোকর পেলে রোদ ত্যাছড়া করে হলেও কোনো কোনো বাড়ির ছাদে গিয়ে পড়ে। তেমনি একটা দোতলা বাড়ির ছাদে এক বালিকা টাওয়েল দিয়ে ভেজা চুল মুছছে। বয়স উনিশ কী বিশ হবে। একবার ডান দিকে মাথাটা কাত করে আরেকবার বাঁ দিকে কাত করে লম্বা চুল শুকিয়ে নিচ্ছে।

মৃদু হাওয়া লিন্টুর সাদা পাতলা টি-শার্ট ভেদ করে যেন শরীর ছুেঁয় যায়। প্রায় তিরিশ বছর আগের একটি দিনের কথা মনে পড়ে। সারা শরীরে যেন বয়ে যায় শীতল পানির ধারা।

ঠিক এমনই এক শীতের বিকেল। ঐ ভেজা চুল শুকানো বালিকার বয়সি একটা মেয়েকে নিয়ে গিয়েছিল অনেকটা পথ। সেই প্রথম কোনো বালিকার সঙ্গে রিকশাভ্রমণ। দুপুরে খেয়ে তৈরি হবার পর কখন তিনটা বাজবে সেজন্য কী অপেক্ষা! সেই অপেক্ষার সময়টা কাটছিল না কিছুতেই। ভাত খাওয়ার কিছুক্ষণ পর এক গ্লাস পানি যখন ঢকঢক করে খাচ্ছিল তখন সারা শরীরে কেমন এক শিহরণ খেলে যায়। মনে হচ্ছিল বুকের ভেতর একটা পিংপং বল ড্রপ খাচ্ছে অহর্নিশ।

তিনটা বাজার পাঁচ মিনিট আগে রিকশাস্ট্যান্ডে এসে দাঁড়িয়েছিল লিন্টু। সেই মেয়েটা এসেছিল লাল শাড়ি পরে। লাল চুড়ি বেশ মানিয়েছিল দু’হাতে। খানিকটা অবাকই হয়েছিল লাল শাড়ি পরে আসায় লিন্টু। মেয়েটা কাছাকাছি আসার পর কোনো কথা না বলে লিন্টু একটা রিকশায় উঠে পড়েছিল। উঠেই হুড তুলে দেয়। মেয়েটা শাড়ি পরে বেশ অস্বস্থিতেই ছিল বুঝেছিল লিন্টু। যাকে বলে কোনো রকমে পরা আর কী। শাড়ি পরে রিকশায় উঠবে কিভাবে খানিকক্ষণ ভাবছিল। বিষয়টা বুঝতে পেরে লিন্টু ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে রিকশায় উঠতে সাহায্য করে। সেই প্রথম ছোঁয়া কোনো মেয়ের হাত।

রিকশায় উঠে কোনো কথা নেই। রিকশা চলছিল। অনেকটা পথ যাওয়ার পর টুকটাক কথা শুরু। শীত বিকেলে হুহু করা হাওয়া বইছিল নীরবেই। সেই মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেছে তার দু’বছর পরেই। ছেলেমেয়েরাও এখন অনেক বড়।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে লিন্টু দেখল সেই চুল শুকানো বালিকা নিচে নেমে গেল। ভেতর থেকে বউয়ের ডাক—‘তোমার ফোন বাজছে’। লিন্টু ঘরের ভেতরে ঢুকল।

শীত বিকেলটা এত দ্রুত শেষ হয়ে যায় কেন? সেই লাল শাড়ি পরা মেয়েটা সেদিন সন্ধ্যার কিছুটা পর রিকশায় চড়ে বাড়ি ফেরার সময় লিন্টুকে বলেছিল।

লিন্টু কিছুদিন আগে জেনেছে মেয়েটা বিয়ের সময় ছেলেপক্ষের দেয়া লাল কাপড় ফেরত দিয়েছিল। পরে অন্য রঙের কাপড় পাঠিয়েছিল ছেলেপক্ষ। লাল চুড়িও আর পরে না দু’হাতে মেয়েটা।

দূরে কোথাও শীতের হাওয়ায় পাতা ঝরে যাচ্ছে। হাওয়ারা কি লিন্টুর বুকের ভেতরকার জমে থাকা হাহাকার কখনো টের পায়? কিংবা ঐ মেয়েটির লাল শাড়ি আর লাল চুড়ি না পরার কারণ জানে?