ভুয়া কে?

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২১, ২১:৫৯

গত বুধবার খাদ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সপ্তম বৈঠকে জানানো হইয়াছে, দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা ৫০ লক্ষ খাদ্যসহায়তা কার্ডের মধ্যে ৭ লক্ষই ভুয়া পাওয়া গিয়াছে। ভুয়া শব্দটি ব্যবহার যদিও আমাদের কাছে পরিষ্কার নহে। ভুয়া বলিতে কি যেই ৭ লক্ষ লোক কার্ড গ্রহণ করিয়াছে তাহারা ভুল নাম-ঠিকানা দিয়াছেন, নাকি তাহাদের কার্ডগুলি নকল? তবে সংবাদ পাঠ করিয়া আমরা উদ্ধার করিতে পারিয়াছি, যাহারা কার্ড পাইবার যোগ্য নহেন বলিয়া কর্তৃপক্ষ মনে করিতেছেন তাহাদের কার্ডকে ভুয়া বুঝানো হইয়াছে। (যদিও উল্লেখ করা হইয়াছে যে, অনেকে দেশে নাই অথবা মারা গিয়াছেন, তাহাদের নামেও কার্ড রহিয়াছে।  তবে সেই সংখ্যাটি নিশ্চয়ই হাতে গোনা।) এখন প্রশ্ন হইল, এই খাদ্যসহায়তা কতটা প্রয়োজন, কতটা বিতরণ করা হইতেছে, তাহা কি সঠিকভাবে নির্ধারণ করা হইয়াছে?

সরকারের বড় দুটি খাদ্যসহায়তা কর্মসূচির একটি দুস্থদের খাদ্যসহায়তা, যাহা ভিজিএফ বলিয়া পরিচিত। আর অন্যটি খাদ্য ও অর্থসহায়তা, যাহা জিআর নামে পরিচিত। ভিজিএফ কর্মসূচির উদ্দেশ্য হইল, দরিদ্র পরিবারের দারিদ্র্য হ্রাস করা, বিশেষ করিয়া অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়নে সহায়তা করা। অন্যদিক জিআর হইতেছে একটি মানবিক সহায়তা কর্মসূচি, যাহা বিভিন্ন বিপর্যয়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণকে করা হইয়া থাকে। ইহা মূলত দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন। কিন্তু খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্যসহায়তা কর্মসূচির নীতিমালায় পরিষ্কার উল্লেখ রহিয়াছে, যাহারা ভিজিএফ বা অন্য সহায়তা পাইয়া থাকেন তাহারা এই ৫০ লক্ষ কার্ডের আওতাভুক্ত হইবেন না। কিন্তু বাস্তবতা হইল, বহু ক্ষেত্রেই বহু স্থানে একাধিক সহায়তা গ্রহণ করিতে দেখা গিয়াছে। এই ক্ষেত্রে যাহারা কার্ড বিতরণের দায়িত্বে রহিয়াছেন তাহাদের ভুয়া বলিলে কেমন হয়? করোনা ভাইরাস দেশের অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতা ব্যাপকভাবে নষ্ট করিয়াছে। অনেক মধ্যবিত্ত দরিদ্র হইয়াছেন, অনেক দরিদ্র হতদরিদ্র হইয়াছেন। তাত্ক্ষণিকভাবে এই শ্রেণি চিহ্নিত করিবার কোনো উপায় বা পন্থা কি গ্রহণ করা হইয়াছে? আমাদের জানামতে হয় নাই। উহা যাহারা করিতে পারেন নাই, তাহাদিগকে ভুয়া বলা যাইবে কি না, ইহাও একটি প্রশ্ন।

ইহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই যে, খাদ্যসহায়তা কার্ডসহ বিভিন্ন কার্ড বিতরণে আমরা দুর্বলতা দেখিতে পাই। অধিকাংশ, ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক দুর্বলতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতা। ইহার মধ্যে চৌর্যবৃত্তিও লক্ষ করা যায়। এমন ঘটনাও বিরল নহে যে, যাহার নামে কার্ড দেওয়া হইয়াছে, তিনি জানেনই না যে, অন্য কেহ তাহার সহায়তা তুলিয়া লইয়া যাইতেছে। শুধু তাহাই নহে, নীতিমালা উপেক্ষা করিয়া ডিলার নিয়োগের বহু ঘটনাও পত্রিকার পাতায় আমরা প্রকাশ হইতে দেখিয়াছি। হতদরিদ্রের তালিকায় ধনী ব্যক্তির নাম দেখা যাইতেছে হামেশাই। ইহা লইয়া আমরা ‘কাহার গলায় মালা’ পরাইব? খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় সুবিধাভোগীদের তালিকা নিয়া নানা অভিযোগ ও বিতর্ক দেখা দিলে সরকারের উচ্চমহল হইতে জেলা প্রশাসক ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বরাবর চিঠি পাঠাইয়া নির্দেশ প্রদান করা হইয়াছিল যে, প্রকৃত দুস্থ ও গরিব ব্যক্তিদের নাম-তালিকা প্রস্তুত করিতে হইবে। কিন্তু তাহাতেও কোনো কাজে আসে নাই। এখন খোদ খাদ্য মন্ত্রণালয়বিষয়ক স্থায়ী কমিটি অভিযোগ করিতেছে যে, ৫০ লক্ষের মধ্যে ৭ লক্ষ কার্ড ভুয়া। আমাদের সম্মুখে তাই বড় প্রশ্ন আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে, ভুয়া তাহা হইলে কে?