মিডওয়াইফারি সেবা

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২১, ২২:০২

নার্সিং পুরোনো পেশা হলেও সে তুলনায় মিডওয়াইফারি পেশা নতুনই বলা চলে। বাংলাদেশে মিডওয়াইফারি কোর্স চালু হয় ২০১০ সালে। ২০১২ সালে পুরোপুরিভাবে ডিপ্লোমা কোর্স চালু হয়। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু রোধে দক্ষ মিডওয়াইফের ভূমিকা অনেক। তবে দুঃখের বিষয়, অধিকাংশ মানুষ এখনো সন্তান জন্মদানে মিডওয়াইফের প্রয়োজন অনুভব করেন না! অথচ স্বাভাবিক সন্তান জন্মদানে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করতে পারেন একজন দক্ষ মিডওয়াইফ। গর্ভাবস্থায় নারীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা, রোগ প্রতিরোধে পরামর্শ, মাতৃগর্ভের তত্ত্বাবধান, ভ্রুণের অবস্থার পর্যবেক্ষণ, ব্যথা উপশমের জ্ঞান প্রদান, গর্ভপাত সম্পর্কিত তথ্য ও সেবা প্রদান, নবজাতকের অস্বাভাবিকতা ও নবজাতকের মৃত্যুজনিত জটিলতায় পূর্ণ মানসিক সেবা প্রদান, মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি সম্পর্কিত তথ্য প্রদান ও কাউন্সিলিং, স্ক্রিনিংসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সহায়তা প্রদান ও কাউন্সিলিং, প্রসবের আগে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যগত অবস্থা নিশ্চিত করে স্বাভাবিক প্রসবে উদ্বুদ্ধ করা, প্রয়োজনে গর্ভবতী নারীর জন্য কেয়ার প্রোগ্রাম সেবা প্রদান, পরিস্থিতি বিবেচনায় গর্ভবতী নারীর বাড়িতে গিয়ে জন্মগত সেবা প্রদান, ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণ শনাক্ত করে অন্যান্য চিকিত্সক ও সহকর্মীদের সমন্বয়ে সেবা ও তথ্য প্রদান, প্রয়োজনে মিডওয়াইফারি প্রশিক্ষণ বিষয়ক বিভিন্ন কর্মশালায় অংশ নিয়ে অভিজ্ঞতা আদান-প্রদানসহ মিউওয়াইফারি বা ধাত্রীবিদ্যা সংশ্লিষ্ট সমস্ত কাজে মিডওয়াইফকে তত্পর থাকতে হয়।

জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (নিপোর্ট) এক জরিপ প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বাংলাদেশে এখনো প্রতি হাজারে ৪০টিরও বেশি শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড  হেলথ সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে নবজাতকের মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ১৭.১ জন, এক বছরের নিচে শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ২৫.১ জন, অন্যদিকে  পাঁচ বছরের নিচে শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৩২।  এছাড়া একই প্রতিষ্ঠানের ২০১৯-এর তথ্য অনুযায়ী, মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে জীবিত জন্মে ১.৭৩। ১৯৯০ সালে প্রতি হাজারে জীবিত জন্মে যা ছিল ৬ জন।

মিডওয়াইফসেবার অগ্রসরতার কারণে মানুষ এখন মিডওয়াইফদের সেবা, কাজ ও গুরুত্ব অনুধাবন করতে শুরু করেছে। স্বাভাবিক সন্তান জন্মদান, মাতৃ ও শিশু মৃত্যু রোধে মিডওয়াইফের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যার ফলে অপ্রয়োজনীয় সিজার কম হচ্ছে। জনসাধারণ এখন প্রত্যন্ত অঞ্চলে মিডওয়াইফদের দ্বারা স্বাভাবিক প্রসবে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে এবং সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে যাবতীয় সেবা পাচ্ছে। মানদণ্ড বিবেচনায় দেশে একজন চিকিত্সকের জন্য তিনজন নার্সের প্রয়োজন। সেখানে রয়েছে একজন। সে তুলনায় বলতে গেলে মিডওয়াইফের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা সেবা প্রদানে মিডওয়াইফদের অনেক বেশি তত্পর থাকতে হয়। তাই মিডওয়াইফারি খাতে বিনিয়োগ আরো বাড়ানো দরকার। মহীয়সী নারী মাদার তেরেসা ও ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল হওয়ার স্বপ্নে এদেশে অনেক সেবিকা বিভোর থাকেন। মিডওয়াইফদের প্রশিক্ষণের জন্য মানসম্মত প্রতিষ্ঠান আরো গড়ে তুলতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে জোর দেওয়া জরুরি। কর্মস্থলে নিরাপত্তা, বদলি প্রক্রিয়া সহজিকরণের পাশাপাশি মিডওয়াইফদের পদোন্নতি নিয়ে বিশেষ উদ্যোগ ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। নার্স ও মিউওয়াইফদের আনুষঙ্গিক কাজ কমিয়ে পুরো মনোযোগ যাতে সেবার প্রতি থাকে সে ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি। ‘এসডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দক্ষ নার্স ও মিডওয়াইফের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। সরকারের বিশেষ বিশেষ উদ্যোগের কারণে জনসাধারণ এখন মিডওয়াইফদের সেবা সম্পর্কে জানতে পারছে, সেবা নিতে হাসপাতালে ছুটে আসছে। মিডওয়াইফের সংখ্যা আরো বাড়ানো গেলে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কমিয়ে আনা কঠিন কিছু নয়।

মিডওয়াইফ, তজুমদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ভোলা