অবৈধ দখল ও নানা ধরনের বর্জ্য ফেলার কারণে ভরাট হয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রামের প্রধান নদী কর্ণফুলী। ৮৬৬ মিটার প্রস্থের এই নদী এখন ৪১০ মিটারে দাঁড়িয়েছে। মূলত শাহ আমানত সেতুর আশপাশে গড়ে ওঠা বৈধ-অবৈধ স্থাপনার কারণে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি পলিথিন, গৃহস্থালি বর্জ্য, কলকারখানার বর্জ্য নদীতে এসে পড়ায় কর্ণফুলী ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। নদীতে ড্রেজিং করেও স্থায়ী সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। আজ ড্রেজিং করলে কাল আবার ভরাট হয়ে যাচ্ছে। নদী ভরাট হওয়ার পাশাপাশি পানিদূষণও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এই নদীতে আগে তিন শতাধিক প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এখন মাছের প্রজাতি ৯০-এর নিচে নেমে এসেছে।
স্থানীয়রা জানান, কর্ণফুলী নদী ভরাট হওয়ার কারণে প্রভাব পড়ছে নগরীর কয়েকটি খালে। ভাটার সময় খাল থেকে পলিথিনসহ নানা বর্জ্য নদীতে গিয়ে পড়ে। আবার জোয়ারের সময় নদীর বর্জ্য খালে চলে আসে। এ কারণে নগরীর খালগুলোও ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বর্জ্যের কারণে নদীর বিভিন্ন স্থানে নাব্যতা সংকট দেখা দিয়েছে।
বর্তমানে নগরীতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ চলছে। প্রকল্পের আওতায় বেশকিছু খাল খনন করা হচ্ছে। চাক্তাই খালের সামনের অংশও খনন করা হয়েছে। কিন্তু খালের উজান থেকে আসা বর্জ্য ও পলিথিনের কারণে খালের মুখ ফের ভরাট হয়ে সরু হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খালের দুই পাশেই রয়েছে অসংখ্য বসতঘর ও বস্তি, যার বাসিন্দারা সব সময় গৃহস্থালি আবর্জনা খালে ফেলে। ভাটার টানে এসব আবর্জনা নদীতে গিয়ে পড়ছে।
কর্ণফুলী নদীর পানি দূষণও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কর্ণফুলীর তীর ঘেঁষে ১৬টি শিল্প জোনে ছোট-বড় ৮০০ শিল্প কারখানা রয়েছে। চামড়ার আড়ত, টেক্সটাইল কারখানা, কেমিক্যাল কারখানা, মত্স্য প্রক্রিয়াজাত কারখানা, সাবান কারখানা, স্টিল মিল, কর্ণফুলী পেপার মিলসহ (কেপিএম) কয়েকটি ব্যক্তিমালিকানাধীন পেপার মিল, চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি (সিইউএফএল), ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) কারখানা, কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো), কোমলপানীয় কারখানা, রং কারখানা, সিমেন্ট কারখানাসহ প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ কারখানার বর্জ্য সরাসরি কর্ণফুলীর পানি দূষিত করছে। এসব কারখানার প্রায় কোনোটাই তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (ইটিপি) ব্যবহার করে না।
নদী বিশেষজ্ঞরা বলেন, চট্টগ্রাম নগরীতে আধুনিক স্যুয়ারেজ সিস্টেম না থাকায় পয়ঃবর্জ্য সরাসরি গিয়ে পড়ছে নদীতে। এতে কর্ণফুলীর দূষণের মাত্রাও বাড়ছে। অন্যদিকে জেলার বিভিন্ন আবাদি জমিতে ব্যবহূত কীটনাশকের ২৫ শতাংশ ৩০টি শাখা খালের মাধ্যমে কর্ণফুলীতে চলে আসে। সিটি করপোরেশনের সলিড ডাম্পিং স্টেশন থেকে বর্জ্যের নির্যাস বর্ষা মৌসুমে কর্ণফুলী নদীতে চলে আসে। তাছাড়া নদীতে চলাচলকারী ১ হাজার ২০০ ছোট লাইটার জাহাজ, শতাধিক অয়েল ট্যাংকার, ইঞ্জিনচালিত সাড়ে ৩ হাজার নৌকার বর্জ্য প্রতিনিয়ত কর্ণফুলীর পানির সঙ্গে মিশছে। নদীতে চলাচলরত নৌযানের পোড়া তেল এবং দুই তীরের বিশাল এলাকার প্রায় ৬০ লাখ অধিবাসীর গৃহস্থালি বর্জ্যও গিয়ে পড়ছে কর্ণফুলীতে।
