যে কোনো দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে কথা বলিবার ও কথা শুনিবার একটি সংস্কৃতি থাকিতে হয়। রক্তচক্ষু দেখাইয়া, বন্দুকবাজি করিয়া তথা শক্তি প্রয়োগ করিয়া আপাতদৃষ্টিতে মনে হইতে পারে, সকল কিছু ঠিকঠাক আছে, সকল কিছু সঠিকভাবে চলিতেছে; কিন্তু এই শক্তিপ্রয়োগ দ্বারা কিছু অর্জন করা যায় না। গণতন্ত্রের সবচাইতে বড় প্রবক্তা যুক্তরাষ্ট্র হইতে শুরু করিয়া তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ সকল ক্ষেত্রে ইহা সত্য। এত বড় শক্তিশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হইয়াও জনগণের ভাষা শুনিতে না পাইয়া এবং প্রেসিডেন্সিয়াল ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহার করিয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প সকলকিছু ‘লেজেগোবরে’ করিয়া ফেলিয়াছেন। এত বড় সিস্টেমের দেশে তিনি সিস্টেমকেই সংকটে ফেলিয়া দিয়াছেন। ঠিক তেমনি পৃথিবীর বিভিন্ন জনপদে সকল কিছু নিস্তরঙ্গ মনে হইলেও কখনো কখনো ভিতরের উত্তাল তরঙ্গ অনেকে উপলব্ধি করিতে পারেন না। প্রাসঙ্গিক ফরাসি বিপ্লবের পূর্বমুহূর্তে রাজা চতুর্দশ লুইয়ের একটি উক্তি উদ্ধৃত করা যাইতে পারে। তিনি বিপ্লবের ঠিক পূর্বে শান্ত ফ্রান্স অবলোকন করিয়া বলিয়াছিলেন, ‘আমাদের সময়টা আমাদের পিতৃকুলের সময়ের চাইতে অনেক শান্ত, নির্ঝঞ্ঝাট।’ কিন্তু তাহার সেই দেখা কি সত্য ছিল? মোটেই নহে। বরং সম্পূর্ণ বিপরীত ফলাফল তাহাদের জন্য অপেক্ষা করিতেছিল। এই বিষয়টি প্রতিটি দেশের প্রতিটি শাসক অথবা শাসকগোষ্ঠীর নিজেদের এবং দেশের জন্য বুঝিয়া লওয়া অত্যন্ত জরুরি।
প্রতিটি দেশের কথা বলিলে তো আমাদের নিজ দেশও বাকি থাকে না; কিন্তু আমাদের প্রেক্ষাপট একটু ভিন্ন লক্ষ্যত্ করিয়া থাকি। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ যাহারা কোনো রাজনীতির সহিত জড়িত নহেন, তাহারা যাচিয়া সরকারের পক্ষে কোনো কথা বলেন না। আবার বিপক্ষে কথা বলিবার লোকও খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। ফলে সকল দিক নিস্তব্ধ বলিয়াই প্রতীয়মান হয়। তবে কিছু বাস্তবতা দেখিয়া আমরা নিরাশ হই, যাহার সহিত উত্থান-পতনের সম্পর্ক না থাকিলেও উন্নয়নসহ রাষ্ট্রীয় কার্যাদি ব্যাহত করিতেছে। দেশে উন্নয়নের মহাযজ্ঞ চলিতেছে কথাটি মোটেই অতিরঞ্জিত নহে। এই যে এত বড় পদ্মা সেতু সরকার নিজস্ব অর্থায়নে করিয়া ফেলিল, ইহা কি কম কৃতিত্বের বিষয়? ইহা একটি ঐতিহাসিক সাফল্য বলিতেই হইবে। সরকারপ্রধানকেও ইহার পুরা কৃতিত্ব দিতে হইবে; কিন্তু আলোর নিচেও কিছু অন্ধকার থাকিয়া যায়। এত বড় কর্মযজ্ঞে, এত বড় মহা পরিকল্পনায় চূড়ান্ত সময়ে আসিয়া আমরা দেখিতে পাইলাম, পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের রেলসংযোগের ডিজাইনে ত্রুটি রহিয়াছে। বলা হইল, রেললাইন যে উচ্চতায় হইতে যাইতেছে তাহাতে সড়ক দিয়া সেতুতে উঠিবার সময় লরি আটকাইয়া যাইবে। সেতুর দুই প্রান্তের ভায়াডাক্ট (সেতু হইতে সড়ক পর্যন্ত উড়ার রেললাইন) নকশায় একই ত্রুটি রহিয়াছে। একই রকমভাবে আমরা বঙ্গবন্ধু সেতুতেও ত্রুটি দেখিতে পাইয়াছিলাম। সেতুর মূল পরিকল্পনায় প্রথমে মিটারগেজ লাইন রাখার পরিকল্পনা ছিল। পরে ব্রডগেজ চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়। মূল সেতুতে দেখা দেয় ফাটল। বর্তমানে সেতুটিতে ধীর গতিতে রেল চালানো এবং এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রক দিয়া যানবাহনের ভার ও গতি নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। অর্থাত্ ত্রুটিপূর্ণই রহিয়া গেল। এই ধরনের ত্রুটির কারণে একদিকে যেমন প্রকল্প ব্যয় বাড়িতে থাকে, অন্যদিকে সময়ক্ষেপণ হইয়া থাকে। কেন এইরূপ হয়? তাহার পিছনেও আমরা পেশাদারিত্বের বদলে সঠিক লোকের সঠিক সময়ে কথা বলিবার অভাব দেখিতে পাই। যাহার যেই কাজ করিবার কথা তাহাকে সেই কাজ করিতে দিতে হয়, শুধু লক্ষ রাখিতে হয় স্বচ্ছতার দিকে। আবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে কথা না বলিবার যেই অভ্যাস আমরা রপ্ত করিয়া ফেলিয়াছি, তাহাও দেশ ও জাতির জন্য খুব ইতিবাচক নহে। আমরা জানি, যেইখানে বহু মত থাকে, বহু জনের কথা শোনা হয়, সেইখানে শত বিতর্কের পরও যে সিদ্ধান্ত আসে তাহা সর্বোত্কৃষ্ট হইয়া থাকে। এই সংস্কৃতি যদি গড়িয়া তোলা যায় তাহা হইলে আমাদের প্রত্যেকেরই কল্যাণ।
