আয়শা খানম আর নেই

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২১, ০০:৪৩

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি, নারী নেত্রী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আয়শা খানম আর নেই। গতকাল শনিবার ভোরে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু এক বিবৃতিতে আয়শা খানমের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

আয়শা খানমের মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় আয়শা খানমের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্রধানমন্ত্রী শোকবাণীতে বলেন, এই নারী নেত্রীর মৃত্যুতে দেশের নারীসমাজ একজন অকৃত্রিম বন্ধু ও সাহসী সহযোদ্ধাকে হারাল।

৭৪ বছর বয়সি আয়শা খানম ফুসফুসের ক্যানসারে ভুগছিলেন। ভোরের দিকে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়, সেখানেই চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। আয়শা খানমের একমাত্র মেয়ে উর্মি খান যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। গত মাসেই তিনি দেশে ফিরেছেন। আয়শা খানম রাজধানীর ধানমন্ডির বাসায় একাই বসবাস করতেন। তার দেখভাল করতেন সহকারী আনোয়ারা। আয়শা খানমের স্বামী বাম রাজনীতিবিদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোর্তুজা খান সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।

হাসপাতাল থেকে আয়শা খানমের মরদেহ সকালে মহিলা পরিষদ কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মরদেহ ধানমন্ডির বাসায় নেওয়া হয়। এরপর আয়শা খানমের মরদেহ তার বাড়ি নেত্রকোনায় নিয়ে যাওয়া হয়। মেয়ে উর্মি খানসহ স্বজন ও পরিষদের কয়েক জন কর্মী এ সময় সঙ্গে ছিলেন। সেখানে এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়। পরে জানাজা শেষে নিজ গ্রাম গাবড়াগাতিতে স্বামীর কবরের পাশে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।

শ্রদ্ধা নিবেদন :নারীর মানবাধিকার আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা এই নেত্রী দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সঙ্গে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। আয়শা খানমের মরদেহ সকাল ৯টার দিকে সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নেওয়া হয়। মরদেহ জাতীয় পতাকায় মোড়ানো ছিল। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠনসহ সর্বস্তরের মানুষ মরদেহে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান। এ সময় তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। শপথ পাঠে নেতৃত্ব দেন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু। 

মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটি, ঢাকা মহানগর কমিটি ছাড়াও এ সময় শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির পক্ষে দীপ্ত ফাউন্ডেশনের জাকিয়া কে হাসান, নারী প্রগতি সংঘের শাহনাজ সুমী, সেভ দ্য চিলড্রেনের উম্মে সালমা, নারী মুক্তি সংসদের সাবিকুন্নাহার, নারীপক্ষের শিরিন হক, দলিত নারী ফোরামের মনি রানী দাশ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ, ঐক্য-ন্যাপ, মনি সিংহ-ফরহাদ ট্রাস্ট ও সিপিবির নারী সেলের প্রতিনিধিবৃন্দ।

সহযোদ্ধারা যা বলেন :আয়শা খানম সম্পর্কে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু ইত্তেফাককে বলেন, তার মৃত্যুতে নারী আন্দোলনের অপূরণীয় ক্ষতি হলো। নারী আন্দোলন আজ যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, তার পেছনে আয়শা খানমের অপরিসীম অবদান ছিল। সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ড. ফৌজিয়া মোসলেম বলেন, তার আদর্শ অনুসরণ করে কাজের মাধ্যমে আমরা তাকে স্মরণ করব। দীপ্ত ফাউন্ডেশনের জাকিয়া কে হাসান বলেন, তার কাছে আমরা নারী আন্দোলনের অনেক কিছু শিখেছি। নারীপক্ষের শিরিন হক বলেন, আমাদের অভিভাবক ছিলেন তিনি।

শোক :আয়শা খানমের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন অ্যারোমা দত্ত এমপি, রাশেদা কে চৌধুরী, সালমা আলী, মাহফুজা খানম, মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর প্রমুখ।

সংক্ষিপ্ত জীবনী :আয়শা খানম ১৯৪৭ সালের ১৮ অক্টোবর নেত্রকোনার গাবড়াগাতি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম গোলাম আলী খান আর মায়ের নাম জামাতুন্নেছা খানম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৯-৭০-এর দিকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। আয়শা খানম বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ছিলেন। রোকেয়া হল সংসদের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাষট্টির ছাত্র আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধসহ সব গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, মানবাধিকার ও প্রগতিশীল আন্দোলনের অন্যতম সক্রিয় সংগঠক ছিলেন। তিনি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। আয়শা খানম ১৯৭২ সালে মহিলা পরিষদের সঙ্গে যুক্ত হন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সাল থেকে তিনি সংগঠনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

 

 

জাতীয় পার্টি-জেপির শোক : জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি এবং দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম আয়শা খানমের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এক শোকবার্তায় জেপির নেতৃদ্বয় বলেন, ‘তিনি ছিলেন এ দেশের প্রগতিশীল সব আন্দোলনের একজন অগ্রসেনানী। তার মৃত্যুতে দেশ একজন প্রগতিশীল নারী নেত্রীকে হারাল। আমরা তাঁর রুহের মাগফেরাত কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সববেদনা জানাই।