চলে গেলেন কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২১, ২২:৩২

স্বাধীনতা ও একুশে পদকপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন আর নেই। গতকাল রবিবার বিকালে তিনি রাজধানীর বনানীতে নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি...রাজিউন)। তার মৃত্যুতে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। তিনি দীর্ঘদিন যাবত্ বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন।

তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক জানিয়েছেন। সাহিত্য জীবনের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ১৯৯৩ সালে একুশে পদক ও ২০১৭ সালে স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন।

রাবেয়া খাতুনের মরদেহ আজ সোমবার বেলা ১২টায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে নেওয়া হবে। সেখানে ঘণ্টাব্যাপি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দুপুর দুইটায় সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে রাখা হবে। এরপর বাদ আসর নামাজে জানাজা শেষে বনানি কবরস্থানে দাফন করা হবে।

রাবেয়া খাতুন ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর ঢাকার বিক্রমপুরে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক বাড়ি মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার ষোলঘর গ্রামে| ১৯৫২ সালের ২৩ জুলাই চলচ্চিত্র পরিচালক এ টি এম ফজলুল হকের সঙ্গে রাবেয়া খাতুনের বিয়ে হয়। তাদের চার সন্তান—চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, কেকা ফেরদৌসী, ফরহাদুর রেজা প্রবাল ও ফারহানা কাকলী।

লেখালেখির পাশাপাশি রাবেয়া খাতুন শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতা করেছেন। এছাড়া তিনি বাংলা একাডেমির কাউন্সিল সদস্য। এছাড়াও তিনি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের গঠনতন্ত্র পরিচালনা পরিষদ, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জুরি বোর্ডের বিচারক প্যানেল, শিশু একাডেমির কাউন্সিল সদস্য হিসেবেও কাজ করেছেন।সাহিত্যের সব শাখায় ছিল রাবেয়া খাতুনের সদর্প বিচরণ। লেখালেখির পাশাপাশি শিক্ষকতা এবং সাংবাদিকতাও করেছেন। দৈনিক ইত্তেফাক, সিনেমা পত্রিকায় নিয়মিত লেখার পাশাপাশি তার সম্পাদনায় পঞ্চাশ দশকে বের হতো ‘অঙ্গনা’ নামের একটি মহিলা মাসিক পত্রিকা। উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, কিশোর উপন্যাস, স্মৃতিকথাসহ চলচ্চিত্র ও নাট্য জগতেও বিচরণ করেছেন রাবেয়া খাতুন। তার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘মেঘের পরে মেঘ’ জনপ্রিয় একটি চলচ্চিত্র। ‘মধুমতি’ এবং ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’ সর্বমহলে ব্যাপক সমাদর লাভ করেছে।

রাবেয়া খাতুনের প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। তার রচিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে—উপন্যাস, গবেষণাধর্মী রচনা, ছোটগল্প, ধর্মীয় কাহিনী, ভ্রমণকাহিনী, কিশোর উপন্যাস, স্মৃতিকথা ইত্যাদি। রেডিও, টিভিতে প্রচারিত হয়েছে তার লেখা অসংখ্য নাটক, জীবন্তিকা ও ধারাবাহিক নাটক। তার গল্পে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে কয়েকটি।

রাবেয়া খাতুন উপন্যাস লিখেছেন পঞ্চাশটিরও বেশি। এ পর্যন্ত চার খণ্ডে সংকলিত ছোটগল্প সংখ্যায় ৪০০-র বেশি। ছোটদের জন্য লেখা গল্প-উপন্যাসও সংখ্যায় কম নয়। তার ছোটগল্প ও উপন্যাসে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট (১৯৬৬), কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি (২০০৩), মেঘের পরে মেঘ (২০০৪), ধ্রুবতারা, মধুমতি (২০১০) ইত্যাদি চলচ্চিত্রগুলোর কাহিনী রাবেয়া খাতুনেরই লেখা।

লেখালেখির জন্য রাবেয়া খাতুন পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। তার মধ্যে আছে বাংলা একাডেমি পুরস্কার-১৯৭৩, হুমায়ুন কাদির স্মৃতি পুরস্কার-১৯৮৯, একুশে পদক-১৯৯৩, অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার-১৯৯৯, বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ পুরস্কার-১৯৯৪, নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক-১৯৯৫, জসিমউদ্দিন পুরস্কার-১৯৯৬, শেরে বাংলা স্বর্ণপদক-১৯৯৬, শাপলা দোয়েল পুরস্কার-১৯৯৬, টেনাশিনাস পুরস্কার -১৯৯৭, ঋষিজ সাহিত্য পদক ১৯৯৮, অতীশ দীপঙ্কর পুরস্কার-১৯৯৮, লায়লা সামাদ পুরস্কার-১৯৯৯, মিলেনিয়াম অ্যাওয়ার্ড-২০০০, টেলিভিশন রিপোর্টার্স অ্যাওয়ার্ড-২০০১, বাংলাদেশ কালচারাল রিপোর্টার্স অ্যাওয়ার্ড-২০০২, শেলটেক পদক-২০০২ এবং মাইকেল মধুসূদন পুরস্কার-২০০৫ ইত্যাদি।