রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন
ইত্তেফাক রিপোর্ট
সড়ক দুর্ঘটনায় ক্রমান্বয়ে বাড়ছে প্রাণহানির হার। বিগত বছরে শুধু ডিসেম্বর মাসে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪০২টি। এতে নিহত হয়েছেন ৪৬৪ জন এবং আহত ৫১৩ জন। নিহতের মধ্যে ৬৭ জন নারী ও ৫১ জন শিশু। এককভাবে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটেছে বেশি। ১৩৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ১৪৭ জন, যা মোট নিহতের ৩১.৬৮ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৩৪.৩২ শতাংশ। দুর্ঘটনায় ১২৮ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ২৭.৫৮ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৪৪ জন, অর্থাত্ ৯.৪৮ শতাংশ। এই সময়ে পাঁচটি নৌ-দুর্ঘটনায় ১৭ জন নিহত হয়েছে। ১২টি রেলপথ দুর্ঘটনায় নিহত ১৯ জন এবং আহত চার জন। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন সাতটি জাতীয় দৈনিক, পাঁচটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। এসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনের বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতাসহ, নির্দিষ্ট বেতন-কর্মঘণ্টা না থাকা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, তরুণ-যুবদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা। এছাড়া দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজিকে দায়ী করেন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজন।
তারা বলেছেন, দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বৃদ্ধি করতে হবে। চালকদের বেতন-কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করতে হবে, বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি করাসহ পরিবহন মালিক-শ্রমিক, যাত্রী ও পথচারীদের প্রতি ট্রাফিক আইনের বাধাহীন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন বন্ধ করে এগুলোর জন্য আলাদা রাস্তা তৈরি করতে হবে। পর্যায়ক্রমে সব মহাসড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণ করতে হবে। গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। রেল ও নৌপথ সংস্কার করে সড়ক পথের ওপর চাপ কমাতে হবে। টেকসই পরিবহন কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে এবং ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ এর সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নেতৃবৃন্দ বলছেন, গত বছরের নভেম্বর মাসের তুলনায় ডিসেম্বর মাসে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা সামান্য কমলেও প্রাণহানির হার বেড়েছে। নভেম্বর মাসে ৪১৭টি দুর্ঘটনায় ৪৩৯ জন নিহত হয়েছিল। এই হিসাবে ডিসেম্বর মাসে দুর্ঘটনা কমেছে ৩.৫৯ শতাংশ। কিন্তু প্রাণহানি বেড়েছে ৫.৬৯ শতাংশ। দুর্ঘটনায় ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সি কর্মক্ষম মানুষ নিহত হয়েছে ৩৪২ জন, অর্থাত্ ৭৩.৭০ শতাংশ। দুর্ঘটনায় প্রাণহানির হার ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেছেন, মোটরসাইকেল চালক ও পথচারী নিহতের ঘটনা চরমভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে অজ্ঞতা, অবহেলা এবং ট্রাফিক আইনের প্রয়োগহীনতা এর প্রধান কারণ। রেল ক্রসিংয়ে তিনটি বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। দেশে ৮২ শতাংশ রেল ক্রসিং অরক্ষিত, ফলে মাঝেমধ্যেই ট্রেনের সঙ্গে সড়ক পরিবহনের ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটছে। এসব রেল ক্রসিংয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই, যা দুঃখজনক।
ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলছে, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ১২৪টি (৩০.৮৪ শতাংশ) জাতীয় মহাসড়কে, ১২৯টি (৩২.০৮ শতাংশ) আঞ্চলিক সড়কে, ১০৪টি (২৫.৮৭ শতাংশ) গ্রামীণ সড়কে, ৪২টি (১০.৪৪ শতাংশ) শহরের সড়কে এবং অন্যান্য স্থানে (ফেরিঘাট, নদীর তীর) তিনটি (০.৭৪ শতাংশ) সংঘটিত হয়েছে। দুর্ঘটনার বিভাগওয়ারি পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। ১১৭টি দুর্ঘটনায় নিহত ১৩৮ জন। সবচেয়ে কম রংপুর বিভাগে। ২০টি দুর্ঘটনায় নিহত ১৮ জন। একক জেলা হিসেবে টাঙ্গাইল জেলায় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। ১৬টি দুর্ঘটনায় ২৯ জন নিহত। সবচেয়ে কম পিরোজপুরে। দুটি দুর্ঘটনায় এক জন নিহত।
