অক্সফোর্ডের করোনার টিকার অনুমোদন দিয়েছে ঔষধ প্রশাসন

সেরামকে আগামীকালের মধ্যে ৬০০ কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২১, ২২:২২

করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন নির্ধারিত সময়েই পাচ্ছে বাংলাদেশ। ভারত থেকে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা আমদানির অনুমোদন দিয়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। গতকাল এই অনুমোদন দেওয়া হয়। এখন এই টিকা আনতে আর কোনো বাধা থাকল না। এদিকে করোনার টিকা আনার সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে সরকার। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা কেনার জন্য ৬০০ কোটি ৪৩ লাখ ১১ হাজার টাকার চেক আজ মঙ্গলবার বা আগামীকাল বুধবারের মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে জমা দেওয়া হবে। সেরাম ইনস্টিটিউটের নামেই এই চেক হচ্ছে। প্রথম চালানের টিকা বাংলাদেশে আসার পর সেরাম ইনস্টিটিউট ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিতে পারবে।

নির্ধারিত সময়েই বাংলাদেশ করোনার টিকা পাবে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এমপি বলেন, ‘ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সাথে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানের চুক্তি করেছে। পাশাপাশি ভারত বাংলাদেশের বন্ধুরাষ্ট্র। ভারতের হাইকমিশনারও ভ্যাকসিন প্রদানে আশ্বাস দিয়েছেন। সবকিছু মিলে সরকার সময়মতোই ভ্যাকসিন পাবে।’ গতকাল সোমবার দুপুরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ভ্যাকসিন-সংক্রান্ত সাম্প্রতিক বিষয়াদি নিয়ে প্রেস ব্রিফিংকালে এসব কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

গত রবিবার একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের প্রধান কর্তৃক অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন বিদেশে পাঠানোর নিষেধাজ্ঞা বিষয়ে একটি সংবাদ প্রচার হলে এর পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল দুপুরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রেস  ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী করোনার টিকা পেতে আরো এক মাস সময় আছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার খবর                 আসার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তাছাড়া তারা কথা বলেছেন ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের এদেশীয় এজেন্ট বেক্সিমকোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে। তাদের সঙ্গে কথার পরিপ্রেক্ষিতে এবং টিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তি থাকার কারণে আমরা আশাবাদী, কোনো সমস্যা হবে না।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরো জানান, সম্প্রতি ভারত সরকার তাদের দেশে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন প্রদানের অনুমতি দিয়েছে। তবে ভ্যাকসিন প্রয়োগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন লাগবে। এসব কারণে ওদের দেশেও ভ্যাকসিন প্রয়োগে আরো কিছুটা সময় লাগবে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভ্যাকসিন আনাসংক্রান্ত সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাখা হয়েছে। দেশের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, সিএমএইচডি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভ্যাকসিন সংশ্লিষ্ট অন্য শাখাগুলোকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এখন চুক্তি অনুযায়ী ভ্যাকসিন আনার প্রক্রিয়াগুলোর ব্যাপারে সরকার উদ্যোগী ভূমিকা অব্যাহত রাখছে। ভারত সরকারও চুক্তি মোতাবেক আমাদের সময়মতো ভ্যাকসিন পাঠাবে বলে অবগত করা হয়েছে। সুতরাং ভ্যাকসিন পাওয়া নিয়ে এই মুহূর্তে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।

করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন রপ্তানিতে ভারতের নিষেধাজ্ঞা তাদের সঙ্গে করা বাংলাদেশের চুক্তির ওপর প্রভাব ফেলবে না জানিয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আবদুল মান্নান বলেন, ‘ভারত সরকার কেবল কমার্শিয়াল কর্মকাণ্ডের ওপর ভ্যাকসিন পাঠানোতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে হওয়া চুক্তির ওপর ভারতের নিষেধাজ্ঞা থাকবে না বলেই জানা গেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ভ্যাকসিন হাতে পেতে বড়জোর ফেব্রুয়ারি মাস লাগতে পারে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, করোনা ভাইরাসের টিকা ক্রয়ের জন্য ৬০০ কোটি ৪৩ লাখ ১১ হাজার টাকার চেক প্রস্তুত রয়েছে। এজিবি থেকে অনুমোদন নেওয়া হচ্ছে। সেরাম ইনস্টিটিউটের নামেই এই চেক হবে। টিকা না আসা পর্যন্ত এই টাকা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে জমা থাকবে। নির্ধারিত সময়ে টিকা না দিলে আমরা টাকা উঠিয়ে নিতে পারব। তবে সেরাম ইনস্টিটিউট সময় চাইলে সময় দেওয়া হতে পারে। তিনি বলেন, করোনা টিকার প্রতিটি ডোজের দাম পাঁচ ডলার। সেখান থেকে বেক্সিমকো এক ডলার পাবে। ভ্যাট, ট্যাক্স ও ট্রান্সফার ফি—সব বেক্সিমকো বহন করবে। অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, ভারত ইন্টারনাল রপ্তানির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ নির্ধারিত সময়েই টিকা পাবে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা করোনা ভাইরাসের যে টিকা তৈরি করেছে, তার উত্পাদন ও বিপণনের সঙ্গ যুক্ত রয়েছে সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার ৩ কোটি ডোজ কিনতে গত ৫ নভেম্বর সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশ সরকার। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি মাসে টিকার ৫০ লাখ ডোজ পাঠাবে সেরাম ইনস্টিটিউট। ভারত থেকে টিকা এনে বাংলাদেশে সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। বাংলাদেশে সেরাম ইনস্টিটিউটে উত্পাদিত ভ্যাকসিনের ‘এক্সক্লুসিভ ডিস্ট্রিবিউটর’ তারা। ভারতের ওষুধ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা গত রবিবার কোভিশিল্ডের জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দিলে বাংলাদেশেও দ্রুত টিকা পাওয়ার আশা জোরালো হয়ে ওঠে। কারণ স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলে আসছিলেন, ভারত অনুমোদন দিলে জানুয়ারির মধ্যেই বাংলাদেশ অক্সফোর্ডের টিকার প্রথম চালান পেয়ে যাবে। কিন্তু সেরাম ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী আদর পূনাওয়ালার বরাত দিয়ে রবিবার রাতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, রপ্তানি শুরুর আগে আগামী দুই মাস তারা ভারতের স্থানীয় চাহিদা পূরণ করতেই জোর দেবে। তার ঐ বক্তব্যের ভিত্তিতে একটি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার খবরে বলা হয়, টিকা রপ্তানিতে ‘নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে’ ভারত। ঐ খবরে বাংলাদেশের টিকা পাওয়া বিলম্বিত হতে পারে বলে শঙ্কা তৈরি হয়।

ভারতের সেরাম উত্পাদিত করোনা ভাইরাসের টিকা দেশে আনা প্রসঙ্গে বেক্সিমকো ফার্মাসিটিউক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নাজমুল হাসান পাপন এমপি বলেন, ‘যে নিউজটার কথা উঠেছে, আমিও শুনেছি। আমি, আমরা এখনো এটি নিয়ে অত চিন্তিত নই। কারণ, আমাদের চুক্তি হয়ে গেছে। চুক্তিতে পরিষ্কার বলা আছে, আমাদের দেশে অ্যাপ্রুভাল দেওয়ার এক মাসের মধ্যে তাদের (সিরাম) টিকা দিতে হবে। এটা একটা আন্তর্জাতিক চুক্তি।’ তিনি বলেন, ‘এটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি। ব্যাংক গ্যারান্টি সরকারের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। সরকারের এটা পৌঁছে দিতে হবে।’ নাজমুল হাসান বলেন, চুক্তি যেহেতু হয়ে গেছে, এটাতে কোনো সমস্যা হওয়ার কারণ নেই। এটা নিয়ে আজ সেরামের সঙ্গেও কথা হয়েছে। তারা এমন কোনো ইঙ্গিত দেয়নি যে করোনার টিকা আসতে দেরি হতে পারে। সরকার যদি নিয়মকানুন মেনে দিয়ে দেয়, এক মাসের মধ্যে টিকা আসবে। এর নিয়ন্ত্রণের দিকটা বাংলাদেশ সরকারের ওপর নির্ভর করছে।

নাজমুল হাসান জানান, ইতিমধ্যে করোনার টিকা পরিবহনের জন্য সাতটি গাড়ি আমদানি করা হয়েছে। এ ছাড়া বিশেষায়িত কুল বক্স আনা হবে। ঢাকায় একটি কেন্দ্রীয় গুদাম তৈরি করা হয়েছে। ‘লজিক্যালি আমরা যে ব্যবসা করে আসছি, সেভাবে বলছি। এটা বাণিজ্যিক চুক্তি। আমরা শুধু সরকারকে সাহায্য করার চেষ্টা করছি।’

বেক্সিমকো ফার্মাসিটিউক্যালসের চিফ অপারেটিং অফিসার রাব্বুর রেজা বলেন, ‘টিকা পাওয়া নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা নেই। আমাদের সঙ্গে তাদের (সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া) নিয়মিত যোগাযোগ আছে। আজও বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে। তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। আমরা নিশ্চিত, আমাদের সঙ্গে যেভাবে চুক্তি হয়েছে সে অনুযায়ী, সেই সময়েই আমরা ভারত থেকে টিকা পাব।’ চুক্তিতে কী আছে জানতে চাইলে রাব্বুর রেজা বলেন, ‘সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী অনুমোদন পাওয়ার পর এক মাসের মধ্যে আমরা প্রথম লটের টিকা পাব।’

৬ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকার প্রকল্প উঠছে একনেকে

একনেকে (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি) উঠছে ভ্যাকসিন ক্রয় প্রকল্প। এক্ষেত্রে শুধু ভ্যাকসিন ক্রয় ও সংরক্ষণ বাবদ খরচ হবে মোট ৪ হাজার ৩১৪ কোটি ৪৯ লাখ ১৭ হাজার টাকা। তবে চলমান একটি প্রকল্পের সঙ্গে এই ব্যয় যুক্ত করায় প্রকল্পটির মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ৬ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। তবে প্রকল্প প্রস্তাবে ভ্যাকসিনের সংখ্যা ও একক মূল্য উল্লেখ করা হয়নি। আজ মঙ্গলবার অনুষ্ঠেয় একনেক বৈঠকে গণভবন থেকে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেকের চেয়ারপারসন শেখ হাসিনা।