রেজাউলকে আটক করেই নির্যাতন শুরু করেন এসআই মহিউদ্দিন

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২১, ২২:২৭

বরিশালে শিক্ষানবিশ আইনজীবী রেজাউল করিমকে আটকের পরপরই নির্যাতন শুরু করেন গোয়েন্দা পুলিশের এসআই মহিউদ্দিন মাহি। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী গৃহবধূ লাইজু বেগম এবং ইমারত নির্মাণশ্রমিক নার্গিস বেগম গতকাল সোমবার সাংবাদিকদের এ তথ্য দেন। তারা জানান, গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে তাদের সামনে দিয়েই শার্টের কলার ধরে রেজাউলকে নিয়ে যান এসআই মহিউদ্দিন। তাদের ব্যবহূত মাইক্রোবাসে ওঠানোর সময় প্রকাশ্যে তার কোমরসহ পশ্চাদ্ভাগে লাথি দেন মহিউদ্দিন। এ সময় তার বাবা ইউনুস মুন্সি ছেলেকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য আকুতি জানালেও তাতে মন গলেনি মহিউদ্দিনের। উলটো বৃদ্ধ ইউনুস মুন্সিকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। রেজাউলকে মেরে ফেলার প্রকাশ্য হুমকি দেন এসআই মহিউদ্দিন।

স্থানীয় বাসিন্দা মাহবুবুর রহমান ও দেলোয়ার হোসেন জানান, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টায় রেজাউলকে গ্রেফতারের সময় পুলিশ মাদক উদ্ধারের দাবি করলেও স্থানীয় কোনো বাসিন্দাকে মাদক দেখানো হয়নি। এসআই মহিউদ্দিন একই এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় তিনি স্থানীয়দের সঙ্গে দম্ভ করে কথা বলতেন।

এদিকে শিক্ষানবিশ আইনজীবী রেজাউল করিমকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন আইনজীবীরা। গতকাল শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের মানববন্ধনে তারা দোষীদের ফাঁসি চেয়েছেন। দুপুর ১২টায় জেলা জজ আদালতের সামনে ফজলুল হক অ্যাভিনিউ এলাকায় এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে আইনজীবী সমিতির সদস্য জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক মিলন ভূঁইয়া বলেন, রেজাউলকে গোয়েন্দা পুলিশ নির্যাতন করে হত্যা করেছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হওয়া উচিত।

এর আগে বেলা ১১টার দিকে নিহত রেজাউলের পিতা ও স্ত্রী বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কাছে বিচার চাইতে যান। এ সময় পুলিশ কমিশনার অভিযুক্ত উপপরিদর্শক মহিউদ্দিনকে বরখাস্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন। রেজাউলের পিতা মামলা করতে চাইলে পুলিশ কমিশনার কোতোয়ালি মডেল থানার ওসির সঙ্গে আলোচনার জন্য বলেন। এ সময় উপস্থিত কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি নূরুল ইসলাম থানায় মামলা নিতে আইনগত জটিলতা আছে উল্লেখ করে তাদের আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেন।  নিহতের ফুপা বাকের মিয়া এ তথ্য জানান। গত সন্ধ্যায় তিনি আরো জানান, মামলা দায়েরের জন্য লেখার কাজ শেষ। আজ সোমবার রেজাউলের বাবা ইউনুস মুন্সী বাদী হয়ে আদালতে মামলাটি দায়ের করবেন। 

পুলিশ কমিশনার মো. শাহাবুদ্দিন খান সাংবাদিকদের বলেন, রেজাউলের পরিবারসহ স্বজনদের অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি কাজ শুরু করেছে। তদন্তে আইনের ব্যত্যয় হয়ে থাকলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রেজাউলের পিতা-মাতা ও স্ত্রীর বিলাপ

 সকালে নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাগরদী হামিদ খান সড়কের ১৪৬৯ নম্বর হোল্ডিংয়ের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, রেজাউল করিমের বিভিন্ন একাডেমিক সার্টিফিকেট নিয়ে বিলাপ করছেন তার বয়স্ক পিতা-মাতা। স্বামী হারানোর শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন রেজাউলের স্ত্রী মারুফা বেগম। তারা জানান, বাবার দেওয়া টাকায় হাতখরচ চলত রেজাউলের। তিনি কোনোভাবেই মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত নন। মাদক কারবারে জড়িত থাকলে বাবার কাছ থেকে পকেট খরচের টাকা নিতেন না তিনি। রেজাউলের স্ত্রী মারুফা বেগম জানান, গত ১ জানুয়ারি রেজাউলকে কারাগার থেকে শের-ই-বাংলা মেডিক্যালে ভর্তি করা হলে তিনি হাসপাতালে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় রেজাউল তার ওপর নির্মম নির্যাতনের অভিযোগ করেন এসআই মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে। এমনকি গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে নিয়ে তাকে তীব্র শীতে খালি গায়ে দীর্ঘক্ষণ ক্ষুধার্ত অবস্থায় বসিয়ে রাখার অভিযোগ করেন তিনি। পুলিশের নির্যাতনে রেজাউলের মৃত্যু হয়েছে দাবি করে অভিযুক্তের বিচার দাবি করেন তারা।

প্রসঙ্গত, গত ২৯ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ৮টায় রেজাউল করিমকে ধরে ঐ রাতেই মহিউদ্দিন বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে কোতোয়ালি মডেল থানায় মাদকের একটি মামলা দায়ের করেন। ৩০ ডিসেম্বর ঐ মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ১ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৯টায় তিনি কারা হাসপাতালে অসুস্থ হলে তাকে শের-ই-বাংলা মেডিক্যালে ভর্তি করা হয়। ২ জানুয়ারি দিবাগত রাত ১২টা ৫ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। ৩ জানুয়ারি দুপুরে মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে ঐ দিন রাতে নগরীর রূপাতলী এলাকায় সিটি করপোরেশনের গোরস্থানে দাফন করা হয় রেজাউলকে।