মৌসুমি সততা বিলাস আমজনতার নাভিশ্বাস

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২১, ২১:৩৪

হঠাত্ ফেসবুক-ইউটিউব সরব। কারোর সততা নিয়ে বারবার মোটিভেশনাল স্পিচ ভিডিও প্রচার করে চলেছে। গুণবাচক বিশেষণে একেবারে ঠাসাঠাসি স্তুতি-বন্দনা। বলা হচ্ছে—এই যোদ্ধা, সেই যোদ্ধা, সিংহপুরুষ! মানবতার ফেরিওয়ালা! অমুক-তমুকের কর্ণধার বিশিষ্ট শিল্পপতি ইত্যাদি ইত্যাদি।

পৃথিবীর সব মানুষ তোষামোদ পছন্দ করে, যা মানবচরিত্রের স্বভাবসিদ্ধ বৈশিষ্ট্য। নতুন নতুন তোষামুদ সাহিত্যে হাত পাকিয়ে সরষে তেলেগু সম্প্রদায় আগে রাজা-মহারাজাদের সন্তুষ্ট করে নিজের সুপ্ত অভিলাষিত কামনা-বাসনা পূরণ করে নিতেন। আস্তে আস্তে একসময় রাজা-মহারাজার দৃশ্য-অদৃশ্য প্রভাবক বনে রাজনীতি, সমরনীতি, ব্যবসানীতি এমনকি হেরেম-বেশ্যানীতি দিয়ে রাজাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলতেন।

সেই ঘরানার তোষামুদে বহুমুখী-বহুরূপী ভীষণ পিচ্ছিল প্রজাতিকে কেউই বাগে আনতে পারেনি। সময় ও পরিস্থিতি বুঝে এই প্রজাতি দেখায় ভানুমতির খেল! মেখে দেয় ষান্ডার তেল।  ব্যস, বত্স! তুমি যাবে কোথায়?

প্রাচীন-মধ্যযুগ পেরিয়ে আধুনিক যুগে ও বিজ্ঞানের চরম উত্কর্ষতায় থেমে নেই এই প্রজাতির দৌরাত্ম্য। কিছুতেই বাগে আনা যাচ্ছে না এই পিচ্ছিল স্বার্থান্ধ প্রজাতিকে। রাজনীতি, সমরনীতি, ব্যবসানীতি, সরকারি-বেসরকারি, দরকারি-বেদরকারি সবার একই চিন্তা—কী প্রকারে! কী উপায়ে কাঙ্ক্ষিত সিদ্ধিলাভ করা যাবে। ভীষণ ব্যাপার হচ্ছে তোষামুদে সরষে তৈল সংস্কৃতি নিয়ে চরম অযোগ্য, ঘুষখোর, মুনাফেক, কালোবাজারি, মীরজাফর, রাজন্য জগেশঠ, খন্দকার মোশতাক ঘরাণার চরম হিংসুটে সুযোগসন্ধানী চক্রটি চক্রব্যূহ বানিয়ে দিকে দিকে সব দিকে বসে আছে। দোষে-গুণে সবার পথচলা। এই চক্র আগেভাগে জেনে নেয় কাঙ্ক্ষিত শিকারের দুর্বল দিকগুলো। ব্যস, কেল্লাফতে। যদি হিতে কাজ না হয়! সংঘবদ্ধ সন্তর্পণে কাঙ্ক্ষিত শিকারের একমাত্র মলত্যাগের সময় ছাড়া সবখানেই মোসাদ-আইএসআই গোয়েন্দা সংস্থা হয়ে ফাঁদ পেতে রাখে। এক কথায় সফলতা চাইই! ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের মতো লেগে থাকার নীতিতে কাঙ্ক্ষিত শিকার একদিন জব্দ হবেই।

কাঙ্ক্ষিত শিকার যেই মাত্র জব্দ হয়েছে! এবার ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। বিজি পলিসি, দয়া পলিসি, নিষ্ঠুর পলিসি, কান্না পলিসি, রম্য-গল্প পলিসি, আপ্যায়ন পলিসি, হঠাত্ রাগ-হাসি পলিসি, পার্টি পলিসি, মুহূর্ত পলিসি, চিত্কার পলিসি দিয়ে দুই হাতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হয়ে সব লুটেপুটে খেয়ে নেয়। ইঁচড়েপাকা হাত পাকিয়ে নেওয়া ধুরন্ধর বস হলে অবশ্য ভিন্ন কথা! এই মহামানব মানবতার ফেরিওয়ালা সেজে দেশ-বিদেশে সরকার-জনগণের সব সম্পদ কখন যে কীভাবে ফেরি করে বিক্রি করেছেন, তা মানবতার ফেরিবাবা ছাড়া কেউ জানেন না।

মানবতার ফেরিবাবা ফেরি করে অনেক সময় ক্লান্ত হয়ে কোনো ষোড়শী সুন্দরী, গৃহবধূর বাড়ি রিসোর্স কিংবা অফিসে মাগুর মাছের ঝোল খেয়ে নারীকোলে মাথা রেখে মানবতাপ্রীতি উপহার দিয়ে জিরিয়ে নেন।

ঘুম হতে উঠে রাজাদের মতো সবাইকে ডেকে নেন, সততার গল্প, সুন্দরবনের হরিণ শিকার, আমাজন বনের দিগম্বর মানবের সাক্ষাত্, শালীর বোন ভোজালি, তালতো বোন রূপালী, বান্ধবী জুলির অকাল প্রসববেদনার গল্প নিয়ে সবাই হু হা হো করেন; নীরবে অশ্রুজল ফেলেন। সতর্ক বহুমুখী-বহুরূপী ধান্ধাবাজ বস এদের মাঝে কাঙ্ক্ষিত তোষামোদ খুঁজে নেন। যে চরম মেরুদণ্ডহীন নপুংসক টাইপ নির্লজ্জ! তার কদর অন্যদের হতে বেশি। যে নিমেষে চরম স্বার্থে ত্যাগসুখে নিজের স্ত্রী, বোন এমনকি নিজের ষোড়শী কন্যা সঁপে দিতে কুণ্ঠাবোধ করেন না।

একসময় বসের বস হয়ে এই চরম বেহায়া তোষামুদে প্রজাতি সবই শাসন-শোষণ করেন। সর্বহারা মাওবাদীদের মতো চাঁদাবাজ হয়ে জনগণের বারোটা বাজিয়ে রাতারাতি গাড়ি-বাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্স করে নেন। নিজের স্বগোত্রের উপরাজা নমস্য বন্দনায় আমুদে জীবন পার করে একসময় সবাইকে সততা বটি খাইয়ে সততার ক্লাস নেন। সবকিছুই রাতারাতি ভুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে সব সম্ভবের দেশে মোটিভেশনাল সুপারস্টার মানবতার ফেরিওয়ালা বনে যান। কিছু দান-দয়া করে লাইভে দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে শিকার গেলা অজগরের মতো ফেনা বের করে এদিক-ওদিক তাকিয়ে হারিয়ে যান।

এই বিরল সর্বভূক প্রজাতি আমজনতা চিনে নিতে অনেক দেরি করে ফেলেন। সর্বভূক ভণ্ড প্রাণীটি আমজনতার সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে বারবার হারিয়ে করোনার নতুন আপডেট নিয়ে সুযোগ বুঝে মৌসুমি সততা বিলাসে কখন কোথায় কীভাবে মানবতার ফেরিবাবা সেজে সর্বস্বান্ত করেন! তা ভুক্তভোগী আমজনতা নাভিশ্বাস নির্মম নিয়তি মেনে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।

n লেখক :প্রাবন্ধিক ও পুলিশ পরিদর্শক