স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন কবে ফিরবে?

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২১, ২১:৪৭

খুব স্বাভাবিকভাবেই চলে আসছিল মানুষের জীবনযাত্রা। স্বাভাবিকভাবেই চলছিল শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন। কিন্তু করোনা আঘাত হানার পর থেকে সবকিছু যেন থেমে গেছে। নিস্তব্ধ হয়ে গেছে সবার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। গত ৮ মার্চ ২০২০ থেকে আমাদের দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর করোনার প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ পর্যন্ত কয়েক দফা ছুটি বাড়ানো হয়েছে। নয় মাসেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। বাতিল করা হয়েছে এইচএসসি, জেএসসি, পিইসিসহ বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা। অনলাইনে বা টেলিভিশনে বিকল্প শিক্ষাদানের চেষ্টা হলেও তাতে তেমন সাফল্য দেখা যাচ্ছে না। ফলে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে শিক্ষাজীবন। স্কুল-কলেজসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো বন্ধ আছে। পরীক্ষা হচ্ছে না অনেক দিন ধরে। হয়তো অনেকে ভুলেই গেছে, পরীক্ষা কীভাবে হয়। খুব স্বাভাকিভাবেই শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার আগ্রহ অনেকটা কমে গেছে এবং তাদের আচরণেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কবে খুলবে—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো কেউ সঠিকভাবে বলতে পারছেন না। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত আকারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার চিন্তা করছেন। কিন্তু তা কবে খুলবে, তা নির্ভর করছে করোনা পরিস্থিতি ভালো হওয়ার পর। অর্থাত্ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার কোনো কর্মপরিকল্পনা এখনো চূড়ান্ত করতে পারেনি সরকার। তাছাড়া এখন স্কুল খোলার ব্যাপারে বেশির ভাগ অভিভাবকেরই বড় ধরনের অনীহা রয়েছে। তবে সম্প্রতি (৬ জানুয়ারি ২০২১) সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, আগামী ফেব্রুয়ারি থেকে সীমিত পরিসরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হবে এবং আগামী মার্চ মাসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পুরোপুরি খোলার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন।   

এখনো করোনা তার দাপট নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে সর্বত্র। করোনা নিয়ে সেই প্রথম থেকেই সবার মধ্যে বিরাজ করছে বিশাল এক আতঙ্ক। করোনার আতঙ্ক ও ভয়াবহতায় গত ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণার পর অনেক স্কুলই অনলাইনে শিক্ষার্থীদের পড়ানোর কাজ শুরু করে। কিন্তু স্কুল কবে খুলবে তার কোনো নিশ্চয়তা না থাকায় রাজধানীর অনেক স্কুল অনলাইনের মাধ্যমে শিক্ষাদান শুরু করে। পরবর্তীকালে অন্যান্য স্থানেও যেখানে ইন্টারনেট আছে, সেখানে এ সুযোগ পেয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। কিন্তু বাস্তবের তুলনায় তা ছিল খুবই স্বল্প পরিসরের উদ্যোগ। এ কথা অনস্বীকার্য যে, অনলাইন বা বিকল্প শিক্ষাদানের এ পদ্ধতিতে দেশের শতভাগ শিক্ষার্থীকে আনা সম্ভব হয়নি।

সরকারি হিসাব মতে, দেশে ৬৪ হাজার প্রাথমিক স্কুল আছে। অন্যদিকে, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মাধ্যমিক স্কুল আছে ১৭ হাজারের মতো। কলেজ বা মহাবিদ্যালয় আছে প্রায় আড়াই হাজার। আর সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি। এর মধ্যে অল্প একটি অংশ এই করোনা পরিস্থিতিতে অনলাইনে শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। আর টিভি দেখার সুযোগ রয়েছে সব মিলিয়ে ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থীর। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, এখন পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ডিজিটাল শিক্ষা কার্যক্রমের আওতার বাইরেই রয়ে গেছে। ক্লাস-পরীক্ষা না হওয়ার ফলে সরকার মাধ্যমিক পর্যায়ে একটি সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচির ভিত্তিতে অ্যাসাইনমেন্ট মূল্যায়ন করে অটো প্রমোশনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং সেই কার্যক্রম এখন চলছে।

বিশেষজ্ঞ মহল অনলাইনে অপর্যাপ্ত শিক্ষাদান, শিক্ষকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না থাকা এবং সিলেবাস অনুযায়ী বিষয়ভিত্তিক পাঠ কার্যক্রম পরিপূণভার্বে শেষ না হওয়ায় সর্বত্রই একটি বড় ঘাটতি থেকে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন। মার্চের শেষ দিকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অনলাইনে ক্লাস নিতে পরামর্শ দেয়। তবে তাদেরকে পরীক্ষা, মূল্যায়ন ও ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে বলা হয়, ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী থাকলে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া যাবে। মূলত এর পরেই বেশ কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এ কার্যক্রম শুরু করে। সর্বশেষ নির্দেশনায় জানা গেছে, অসমাপ্ত পাঠ্যসূচির অনলাইন ক্লাস থাকবে; কিন্তু ল্যাবরেটরিভিত্তিক ক্লাস পরে স্বাভাবিক অবস্থা এলে শেষ করা হবে। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ সুযোগ থেকে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘ সময় স্কুলের বাইরে থাকার কারণে অনেক শিশুর মধ্যেই আচরণগত পরিবর্তন আসতে পারে। এমন পরিস্থিতি একদিকে যেমন তাদের সঠিক মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে, অন্যদিকে নিয়মতান্ত্রিক জীবনে অনভ্যস্ত হওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। অনলাইন ক্লাসের কারণে শিশুদের মোবাইল এবং ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তি বাড়তে পারে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। কিছু কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইনে ক্লাস পরিচালনা করলেও বেশির ভাগই বন্ধ রয়েছে। যার ফলে শিক্ষার্থী শিশুরা অনেকটা ঘরবন্দি হয়ে আছে এবং বিশেষ করে মোবাইল ফোনের ওপর আসক্ত হয়ে পড়ছে। আসক্ত হচ্ছে কম্পিউটার, ল্যাপটপ ইত্যাদিও ওপরও। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এ ধরনের আচরণগত পরিবর্তন শিশুদেরকে মহামারি পরবর্তী জীবনে খাপ খাইয়ে নিতে অসুবিধার সৃষ্টি করবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললেও সেখানে অন্য শিশুদের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো এবং শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ বজায় রাখা কষ্টকর হবে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা—কবে আবার শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে, কবে আবার তারা তাদের নিজ নিজ প্রতিভায় বিকশিত হতে পারবে।

n  লেখক :কবি ও কলাম লেখক