খেতে খেতে ব্লগিং!

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০১৯, ১৯:০০

সিদরাতুল সাফায়াত ড্যানিয়েল

শহরের রেস্টুরেন্টগুলোতে ঘুরে ঘুরে সুস্বাদু ও মানসম্মত খাবার খাওয়াই তানজিলার পছন্দ। ভালো ও নতুন রেস্টুরেন্টগুলোর খোঁজ পেতে তার কোনো সমস্যাই হয় না। স্মার্টফোনটি হাতে নিয়ে ফেসবুকে ঢুকলেই মেলে নতুন নতুন খাবারের দোকানের সন্ধান। এছাড়া বিভিন্ন ব্লগ তো রয়েছেই। আর এসব খোঁজ যারা দেন তারা পরিচিত ফুড ব্লগার নামে।

২০০৫ সাল থেকে নানা বিষয়ে ব্লগ লেখা শুরু করেন তরুণ-তরুণীরা। ব্লগিং যেকোনো বিষয়ের ওপর হয়ে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক সময়ে এসে আমাদের দেশে ফুড ব্লগিং হয়ে উঠেছে বেশ জনপ্রিয়। যদিও এর শুরুটা হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়াতে ২০১৩-১৪ সালের দিকে। এই ফুড ব্লগিংকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে বিভিন্ন ধরনের কমিউনিটি। ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষজন নিজেদেরকে একত্রে করেছেন এই ফুড ব্লগিংয়ের মাধ্যমে। আমাদের দেশের এই ফুড ব্লগিং সম্পর্কে জানতে আড্ডা দিয়েছিলাম এই প্রজন্মের কয়েকজন ফুড ব্লগারের সাথে। যারা নিজেরদের একত্র করেছে এই ফুড ব্লগিংয়ের মাধ্যমে।

আড্ডার একেবারে শুরুতেই প্রশ্ন ছিল, কিভাবে এই ফুড ব্লগিংয়ের সাথে তারা নিজেদেরকে যুক্ত করলো? উত্তরে পুরান ঢাকার সুরাইয়া হোসাইন জানান, রেস্টুরেন্টে প্রচুর খাওয়া-দাওয়া হয় আমার। সেইসাথে পুরান ঢাকার বাহারি খাবারের একটা স্বাদ আমি ছোটবেলা থেকেই পেয়ে আসছি। তখন ভাবলাম ভিন্নকিছুর চেষ্টা করা যাতে পারে। ছোটবেলার ডায়েরি লেখা থেকে গড়ে ওঠে আমার লেখালেখির অভ্যাস আর সেইসাথে ছবি তোলার শখ তো আছেই। এই দুই মিলে শুরু হয় ফুড ব্লগার হিসেবে আমার পথচলা।

সুরাইয়া ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের শিক্ষার্থী। তার কথা শেষ না হতেই আহসান উল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিটেকচার বিভাগের শিক্ষার্থী তাহসিন তামান্না যুক্ত করলো নিজের কথাগুলো। তামান্না জানান, সে রান্না করতে খুব পছন্দ করে। মায়ের হাতের রান্না আর টিভিতে বিভিন্ন দেশের রান্নার শো দেখে তার আগ্রহ জন্মে এই রন্ধন শিল্পের প্রতি। সেইসাথে ফুড ফটোগ্রাফির ওপর প্রবল আগ্রহ থেকে শুরু হয় তার পথচলা।

বাংলাদেশে কিভাবে শুরু হলো এই ফুড ব্লগিং? প্রশ্নের জবাবে অহর্নিশ আহমেদ বলেন, ‘শুরুতে ফেসবুককে প্লাটফর্ম হিসেবে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে শুরু হয় ফুড ব্লগিং। মূলত একই উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশের খাবার সম্পর্কে জানা, এর দাম, মান, স্থানভেদে খ্যাতি এবং সুস্বাদু খাবারের বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে একদল খাবারপ্রেমী মানুষ ফেসবুকের একটা গ্রুপের মাধ্যমে শুরু করে এই ফুড ব্লগিং। যদিও প্রথমে এটা ফুড ব্লগিং হিসেবে পরিচিত ছিল না। আস্তে আস্তে এখানে যুক্ত হয় লেখা ও ছবিপ্রেমী মানুষজন। নান্দনিক লেখা ও রুচিশীল ছবির মাধ্যমে মানুষজন তুলে ধরে খাবারের স্বাদকে। আর এভাবেই গড়ে ওঠে ফুড ব্লগিং, যা এখন ফেসবুককে ছাড়িয়ে ইনস্টাগ্রামেও বেশ সাড়া ফেলছে।’

এর সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী রাকিব একটু সংযুক্ত করে বলেন, ‘বিভিন্ন বিভাগীয় শহরকে কেন্দ্র করেও গড়ে উঠছে এই ফুড ব্লগিং। এতে করে নতুন জায়গায় খাবারের অভিজ্ঞতা নিয়ে কারো সমস্যায় পড়তে হচ্ছে না। ফলে অর্থ, সময় দুটোই সাশ্রয় হওয়াতে এই ফুড ব্লগিং বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।’

এই কাজটা বেশ মজার! অহর্নিশ আহমেদ জানান, তারা সাধারণ ক্রেতার মতোই যান রেস্তোরাঁয়। খাওয়া-দাওয়া করেন এবং খেয়াল রাখেন কর্মীরা রেস্তোরাঁর নিয়মকানুন মেনে চলছেন কি-না! তারপর নিজেদের মতো করে রিপোর্ট তৈরি করেন তারা। তার মতে, ‘এই কাজে  যুক্ত হওয়ার সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, নজর রাখার ক্ষমতা। শুধু খাবারের স্বাদ যাচাই করলেই হবে না। রেস্তোরাঁ যথেষ্ট পরিচ্ছন্ন কি-না, কর্মীরা ঠিকমতো সেবা দিচ্ছেন কি-না, খেয়াল করতে হবে সবই।’

ঢাকাকে যদি আমরা উদাহরণ হিসেবে ধরি তাহলে দেখতে পাবো ঢাকায় বেশিরভাগ বিদেশি খাবারের কিংবা ফার্স্টফুডের দোকান। পুরান ঢাকায় খুঁজে পাওয়া যায় বাকরখানি, বিরিয়ানি, লাচ্চি, পান ইত্যাদির মতো মোগলীয় খাবারের দোকান। আর এই ফুড ব্লগিংয়ের মাধ্যমে সকলের মাঝে একটা কালচারাল বদল হচ্ছে বলেই আজ পুরান ঢাকায় পাওয়া যায় নানা বিদেশি খাবারের রেস্টুরেন্ট। নতুন ঢাকাতে পাওয়া যাচ্ছে ট্রাডিশনাল সেই খাবারগুলো। শুধু ঢাকা নয়, অন্যান্য বিভাগীয় শহরগুলোতেও এই খাবারের বদল হচ্ছে।—এমনটাই বলছিলেন তাহসিন তামান্না।

ফুড ব্লগিংকে অনেকেই পেশা বলে মনে করেন। তবে এটাকে পেশা হিসেবে না বলা গেলেও তা ফুড ইন্ডাস্ট্রির প্রয়োজনীয় অংশ। খাবারের রেসিপি, রেস্তোরাঁর রিভিউ, ফুড স্টোরি সবই থাকতে পারে ফুড ব্লগে। এছাড়া খাবারের ছবি হতে হবে এমন যা চোখে দেখলেই খেতে ইচ্ছে করে! এই দায়িত্বটাই পালন করেন ফুড ব্লগাররাই। ফুড ব্লগার হতে গেলে শুধু খেতে ভালোবাসলে হবে না। খাবার নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করতে হবে। বিভিন্ন খাবার সম্পর্কে জানাটাও জরুরি।

আড্ডার একেবারে শেষের দিকে এসে প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করা হয় বাংলাদেশে এই ফুড ব্লগিংয়ের ভবিষ্যত্ এবং তাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে। এক্ষেত্রে তারা মনে করেন এই ফুড ব্লগিংয়ের মাধ্যমে তারা চেষ্টা করছে গ্লোবালি বাংলাদেশকে ভিন্ন একটা আঙ্গিকে তুলে ধরতে। যার ফলস্বরূপ দেশের বাইরের ফুড ব্লগিং কমিউনিটিতে নিজের দেশের খাবারকে স্টাবলিস করতে তারা সক্ষম হয়েছে। সেইসাথে বিভিন্ন দেশের ফুড ব্লগারা বাংলাদেশের খাবার টেস্টের জন্য আসতে ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন। একইভাবে আমাদের এখান থেকেও অন্য দেশের খাবার টেস্টের জন্য আমন্ত্রণ পেয়েছেন। এর ফলে তারা মনে করছেন অন্যদের সামনে নিজেরদের ফুড কালচারকে তুলে ধরার একটা মোক্ষম উপায় হলো এই ফুড ব্লগিং। এছাড়াও আমদের নিজেদের দেশের মধ্যে খাবারের যে ভিন্নতা ও বৈচিত্র্য রয়েছে তা মানুষের সামনে খুব সহজেই চলে আসবে এই ফুড ব্লগিংয়ের মাধ্যমে।