আবারও সচ্ছলতার সৌরভ ছড়াচ্ছে ফুল

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২১, ২২:৩২

দীর্ঘ নয় মাস পর গত ডিসেম্বরে এসে মুখে হাসি ফোটে ফুল ব্যবসায়ীদের। করোনা মহামারির স্থবিরতা কাটিয়ে ফুল বেচাকেনায় সুদিন ফিরলেও ফুলচাষিদের দুঃখের কাল কাটেনি। গত নয় মাসে খেতেই সব ফুল পচে গেছে। তাই ফুল চাষ বাদ দিয়ে সবজি চাষ শুরু করেছেন অনেক ফুলচাষি। অপার সম্ভাবনা নিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছিল ফুলবাণিজ্য। ফুল চাষ করে কৃষকও দেখছিলেন লাভের মুখ। কিন্তু সব হিসাবনিকাশ পালটে দিয়েছে করোনা মহামারির অভিঘাত। তাই ফুলচাষিদের বাঁচাতে এবং ফুলের বাজার দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশে প্রসারিত করতে সরকারের সহযোগিতার কথা জানিয়েছেন ফুলচাষি ও ব্যবসায়ীরা।

১৯৮৩ সালে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষের যাত্রা শুরু হয়েছিল দেশে। যশোরের ঝিকরগাছার পানিসারা গ্রামে কৃষক শের আলী বাংলাদেশের ফুল বিপ্লব শুরু করেছিলেন। ফুল চাষের সেই পথিকৃত্ শের আলীও এবার ফুল বাদ দিয়ে চাষ করছেন সবজির। দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে তিনি জানান, বারি-৪ জাতের টম্যাটো চাষ করেছেন। বলেন, ফুলে ‘মার’ খেলেও সবজি চাষ করে টিকে থাকার চেষ্টা করছি। যতই করোনা আসুক, ফুল না কিনলেও সবজি মানুষ কিনবে। কারণ সবজি মানুষকে খাওয়াই লাগবে।ভোরের আলো ফোটার আগেই জেগে ওঠে শাহবাগের ফুলের বাজার। এ অঞ্চলের ফুল ব্যবসায়ীরা ভিড় জমান ফুলের এ পাইকারি বাজারে। সেখানে ফুল কিনতে এসেছিলেন সূত্রাপুরের ফুল ব্যবসায়ী টাচ ইভেন্টেসের স্বত্বাধিকারী শাহানশাহ মোহাম্মদ। তিনি বলেন, জানুয়ারিতে বিয়ে, পার্বণ রয়েছে। তাই ফুল বিক্রি বেড়েছে। গত বছরের মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পুরাই বসা ছিলাম। ব্যবসা ছিল না। এখন হিন্দু সম্প্রদায়ের বিয়ের লগ্ন রয়েছে কয়েকটা। তাছাড়া বিভিন্ন পার্বণ রয়েছে। এসব উত্সবকে ঘিরে ফুল বিক্রি হচ্ছে। ফুল বিক্রি শুরু হওয়ার কথা জানালেন পাইকার সাইফুল ইসলামও। বললেন, ‘আমাদের ব্যবসা ছিল না একেবারেই। এখন কিছুটা বিক্রি বেড়েছে।’

ফুল চাষের চালচিত্র : ফুলের সুবাস অঞ্জু সরকারের জীবনে ছড়িয়েছে সচ্ছলতার সৌরভ। যশোরের কেশবপুরের অঞ্জু ১৮ বছর আগেও মানুষের বাসায় কাজ করতেন। ফুলের চাষ করে এখন বছরে লাখ লাখ টাকা আয় করেন তিনি। কিনেছেন আট বিঘা জমি, দুটি গাড়ি। ফুলের অর্থনীতি বদলে দিয়েছে অঞ্জুর মতো হাজার হাজার মানুষের জীবন। শুধু ফুলের সুবাস নয় ফুলের অর্থনীতির সৌরভ দেশ জুড়েই সৃষ্টি করেছে নতুন সম্ভাবনা।

গত চার দশকের যাত্রায় বাণিজ্যিক ফুল চাষ এবং তার বেচাকেনা বার্ষিক দেড় হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। দেশের ৭৫ শতাংশ ফুলের চাহিদা মেটে দেশের চাষিদের মাধ্যমে। দেশে ফুল উত্পাদনে জড়িত আছেন প্রায় ১৫ হাজার কৃষক এবং ফুল উত্পাদন ও বিপণন ব্যবসায়ে অন্তত দেড় লাখ মানুষ সরাসরি নিয়োজিত। ফুল সেক্টরের কার্যক্রমের মাধ্যমে জীবিকা উপার্জন করছেন প্রায় ৭ লাখ মানুষ। ফুলশিল্পের সম্প্রসারণের ফলে আজকাল ফুলের ব্যবহারও অনেক বেড়েছে। দেখা গেছে, ২০০৯-১০ অর্থবছরে যেখানে বাত্সরিক ফুল বিক্রি হয়েছে ২৫২ কোটি টাকা। সেখানে ২০১৪-১৫-তে তা ৮০৫ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। আর  ২০১৮-১৯ এসে তা ১ হাজার ৫০০ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। এখন বিয়ে-শাদি তো বটেই, অন্যান্য সামাজিক ও জাতীয় অনুষ্ঠান, যেমন—মাতৃভাষা দিবস, ভ্যালেনটাইনস ডে, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসসহ জাতীয় ও সামাজিক জীবনের অনেক ক্ষেত্রে যেমন—বিবাহবার্ষিকী, জন্মদিন, পূজা-পার্বণে ফুলের ব্যবহার অনিবার্য হয়ে পড়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিপ্তর জানায়, বর্তমানে দেশের ২৪টি জেলায় প্রায় ৩ হাজার ৫২০ হেক্টর জমিতে ফুলের উত্পাদন হচ্ছে। এর মধ্যে খুলনা বিভাগে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে ফুলের চাষ হয়। ২য় স্থানে রয়েছে ঢাকা বিভাগ ৬৯০ হেক্টর এবং ৩য় স্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ ১২১ হেক্টর। এছাড়া রংপুর বিভাগে ৪২ হেক্টর।

গত প্রায় চার দশকে যশোরের ঝিকরগাছার গণ্ডি ছাড়িয়ে দেশের ২৪টি জেলায় ফুল চাষের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ফুল চাষকে ঘিরেই কৃষকের স্বপ্ন ডানা মেলে। ফুল চাষ বাণিজ্যিক হয়ে ওঠায় তাকে ঘিরে লাখো মানুষ স্বপ্ন বোনে। দেশের বাজারে দিন দিন চাহিদা বাড়ছে ফুলের।

বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সাংগঠনিক সম্পাদক জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর বলেন, চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারত, চীন, থাইল্যান্ড ও কেনিয়া থেকে প্রতি বছর প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ফুল আমদানি হয়। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানি নয়, ফুল রপ্তানির উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা জরুরি। অস্ট্রেলিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে ফুল রপ্তানি শুরু হলেও দেশে ফুল রপ্তানির ক্ষেত্রে সরকারিভাবে সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারিত নয় বলে অভিযোগ জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আব্দুর রহিম জানান, ফুলচাষিদের কল্যাণে তিনটি উদ্যোগকে দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। এর মধ্যে ইউএস এইডের অর্থায়নে এলজিইডির নির্মাণাধীন গদখালীর ফুল প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রটি আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে গদখালীতে ২৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাবিত ফুল গবেষণা কেন্দ্রের অনুমোদন এখনো একনেকে হয়নি বলে হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে ঢাকার গাবতলীতে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের নির্মাণাধীন ফুলের স্থায়ী বাজারের নির্মাণকাজের ঢিলেঢালা ভাবটাকে গতি এনে দ্রুত সম্পন্নের দাবি জানান তিনি।

ফুল ব্যবসার বাধা ও সুপারিশ : ফুল ব্যবসাকে এগিয়ে নেওয়ার বেশকিছু বাধার কথা জানালেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন, ফুল শিল্পের এসব সুযোগ ও সম্ভাবনার মধ্যেও ফুল শিল্প বর্তমানে যেসব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন তা হচ্ছে—ফুল উত্পাদন প্রযুক্তির ওপর অনেক কৃষকের জ্ঞানের অভাব, অতিরিক্ত মূলধন ব্যয়, বাংলাদেশে ফুলের বীজ ও চারার অপ্রাপ্যতা এবং এ ব্যাপারে ভারত থেকে আমদানি নির্ভরতা, গ্রিন হাউজ নির্মাণের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির অপ্রাপ্যতা, ফুল চাষের জন্য বিশেষ কম্পাউন্ড সারের অভাব, ঢাকাসহ বড় বড় শহরগুলোতে স্থায়ী পাইকারি ফুলের বাজারের অভাব, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উত্পাদন প্রযুক্তির অভাব, কৃষক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে ২০ শতাংশ ফুল নষ্ট হওয়া, ফুল নিয়ে প্রয়োজনীয় গবেষণার অভাব ও একটি জাতীয় ফুলনীতি না থাকা।

যশোরের বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ফুলের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ফুলের খেতেই সবজি চাষ শুরু করেছেন অনেক কৃষক। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে ফুলে লোকসান হতে পারে ধরে নিয়েই চাষিরা অন্য ফসল আবাদে ঝুঁকে পড়েছেন। ফুল খেতের প্রায় ৩০ ভাগ জমিই এখন বিকল্প এ চাষের আওতায় বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। এসব জমিতে ফুলের পাশাপাশি পেঁপে, টম্যাটো, ওলকপি, বাঁধাকপি, শশা, ক্যাপসিকাম, পেঁয়াজ ও সরিষা আবাদ হচ্ছে। পটুয়াপাড়ার মো. মঞ্জুর আলম বলেন, ‘জারবেরার একেকটি শেড তৈরি করতে ৮-৯ লাখ টাকা খরচ হয়। তিনটি শেড আম্ফানে ভেঙে গেছে। করোনাকালীন ব্যবসায় ধস নামে। এতে করে পুঁজিহারা হই। টম্যাটো চাষ করে ক্ষতি খানিকটা পুষিয়ে নিয়েছি। নতুন করে ফুলের একটি শেড বানাচ্ছি। আর গাছে ক্যাপসিকামের যে ফলন আসছে, তাতে ক্ষতি আরো পুষিয়ে যাবে।’