প্রত্যাশা পুঁজিবাজার সুরক্ষা

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২১, ২২:৩৯

নিন্দুকেরা প্রায়ই বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার শেয়ারবাজার বোঝে না। কিংবা এ সরকারের সময় পুঁজিবাজার নীরব থাকে। সমালোচকদের কথাগুলো দৃশ্যমান বাস্তবতা। বিগত ১৫ বছর আমরা দেশের পুঁজিবাজারকে ভালো এবং নির্ভরযোগ্য অবস্থানে দেখতে পাইনি। যে কোনো দেশের সমৃদ্ধ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত এবং পুঁজিবাজার। প্রথম খাতটিতে আমাদের ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়েছে। কিন্তু কিছু লোকের দুরভিসন্ধি, অদক্ষ পরিচালনা এবং কারসাজিতে শেয়ারবাজরের শৃঙ্খলা ব্যাহত হয়েছে একাধিকবার।

পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞরা বলেন, আস্থাই বাজারের ভিত্তি। ১৯৯৬ সালে সংঘটিত শেয়ার কেলেঙ্কারির পর গোটা বাজারের ভিত্তি যে নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল তা আজো সুদৃঢ় করা সম্ভব হয়নি। অর্থাত্ বাজারে আস্থাহীনতা এখনো বিদ্যমান বিশেষ করে সেকেন্ডারি মার্কেটে। বিনিয়োগ বাণিজ্যে আস্থা বা বিশ্বাস এমন এক উপাদান তা নষ্ট হলে পুনরুদ্ধার করা বেশ কঠিনই হয়ে যায়। জাতীয় বাজেটে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় আর্থিক সুবিধা দেওয়া হলেও পুঁজিবাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব তেমন একটা পরিলক্ষিত হয় না। এর প্রধান কারণ ‘৯৬ সালের ঐতিহাসিক শেয়ার কেলেঙ্কারির ঘটনাসহ পরে সংঘটিত কারসাজি হোতাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত বিচার না সম্পন্ন করা। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অধিকাংশ শিক্ষিত বেকারের এক অংশ সেই সময় দুটি পয়সা রোজগারের আশায় যে স্বপ্ন নিয়ে শেয়ারবাজার বিনিয়োগে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সে বাজার এক ফুত্কারে যেন শেষ হয়ে যায়! পুঁজি হারিয়ে অনেকে আত্মহুতিও দেয়। ম্যানুপুলেশনে বিনিয়োগ শ্রেণির কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের অর্থ অনেকটা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। সে অর্থ দিয়ে অনেকে ব্যাংক-বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মালিক হন। বনে যান উদ্যোক্তা-শিল্পপতি। শেয়ার ম্যানুপুলেশনে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সরকারও বাজারে আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। দায়িত্বশীল আচরণ করেননি বিশেষজ্ঞরাও। পুঁজিবাজারের সরকারি নিয়ন্ত্রক সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) চেয়ারম্যান ড. মির্জা আজিজুল ইসলাম সে সময় বলেছিলেন, ‘দেশের পুঁজিবাজারের বিচারের বিষয়টি আদালতের এখতিয়ার।’ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তিনি পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য ‘৯৬ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারির ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া জরুরি তা বলেননি। বরং ক্ষমতা থেকে বের হয়ে তিনি পুঁজিবাজারের বাস্তবতা উপলব্ধি করেছেন মাত্র।

পুঁজিবাজারের প্রাইমারি মার্কেটে বিনিয়োগকেই অনেকে ঝুঁকিমুক্ত মনে করেন। পুঁজিবাজার পরিচালনায় তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান, স্টক এক্সচেঞ্জ, মার্চেন্ট ব্যাংক, ব্রোকারেজ হাউজ, জয়েন্ট স্টক কোম্পানি, নতুন নতুন প্রতিষ্ঠানসহ বিশাল এলাকার নিয়ন্ত্রণ বিএসইসির দ্বারা সত্যিকার অর্থে কি সম্ভবপর হচ্ছে?

‘৯৬-র মতো না হলেও সেকেন্ডারি মার্কেটে শেয়ার লেনদেনে দর ওঠানামায় এখনো ম্যানুপুলেশনের অভিযোগ আছে। অতি সম্প্রতি পুঁজিবাজারে বিমা খাতের শেয়ার মূল্যের অস্বাভাবিক উত্থান জুয়াকেও হার মানিয়েছে। চার মাসে প্রায় ৮গুণ বেড়েছে কোনো কোনো কোম্পানির শেয়ারের দাম। করোনা অতিমারির মধ্যে যেখানে মানুষের বিমা করা কমেছে, সেখানে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে দ্রুতগতিতে এ খাতের শেয়ারের দাম বেড়েছে। এক্ষেত্রে সংঘবদ্ধভাবে কয়েকটি গ্রুপ মিলে শেয়ার কিনে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ওসব শেয়ারের দাম বাড়িয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার দৃশ্যমান কোনো তত্পরতা নেই।

যেসব পদক্ষেপ কার্যকর করা হলে পুঁজিবাজারে ব্যাপক আস্থা আসতে পারে এবং এর ফলে বাজার চাঙ্গা হতে পারে—১. জাতীয় স্টক এক্সচেঞ্জসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে স্টক এক্সচেঞ্জ স্থাপন; ২. ‘৯৬-র শেয়ার কেলেঙ্কারির মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান; ৩. ঋণখেলাপি, বিতর্কিত বা আর্থিক কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নীতি নির্ধারণে কোনো কমিটিতে না রাখা; ৪. স্বনামধন্য দেশি-বিদেশি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে আনা এবং বিদেশি কোম্পানির মালিকানা স্বত্ব নিশ্চিত করা; ৫. তালিকাভুক্ত কোম্পানির পর্ষদে নিরপেক্ষ পরিচালক পদে কোম্পানির চেনা ব্যক্তিকে মনোনয়ন না দেওয়া; ৬. বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বিতর্কিত নয়—১০ বছর ভালো ফলাফল অর্জনকারী এমন প্রতিষ্ঠানের গণপ্রস্তাব ছাড়পত্র নিশ্চিত করা; ৭. অতীতের মতো বিএসইসিতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের ১৫ সদস্য বিশিষ্ট বাজার বিশেষজ্ঞ পরামর্শক কমিটি গঠন করে পুঁজিবাজার পরিচালনা করা এবং ৮. আইপিও বা অন্য ক্ষেত্রে অভিযোগ আসুক বা নাই আসুক বিও হিসাবগুলো নিয়মিত তদারকি ও পরীক্ষা করা।

বলতেই হয়—এ বাজার সমৃদ্ধ না হলে প্রকৃতপক্ষে দেশের অর্থনীতি এগুবে না।

ঢাকা