যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি ফাইজারের তৈরি করা করোনার টিকাও পাচ্ছে বাংলাদেশ। তারা বিনা মূল্যে ৪ লাখ টিকা দেবে। ফাইজারের টিকা মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখতে হয়। এসব টিকা সংরক্ষণের প্রস্তুতিও গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, আইইডিসিআর, আইসিডিডিআরবিতে মাইনাস ৭০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় টিকা রাখা যায় এমন রেফ্রিজারেটর আছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ইত্তেফাককে জানান, ফাইজার যে অফার দিয়েছে আমরা তা গ্রহণ করেছি। তারা বিনা মূল্যে ৪ লাখ করোনা ভ্যাকসিন দেবে, যা সম্মুকযোদ্ধাদের দেওয়া হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার প্রথম চালান আসার চূড়ান্ত তারিখ আজকালের মধ্যে জানিয়ে দেওয়া হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম ইত্তেফাককে জানান, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার প্রথম চালান আগামী ২১ থেকে-২৫ জানুয়ারির মধ্যে আসছে। প্রাথমিক আলোচনার মাধ্যমে তারা সম্ভাব্য এই তারিখ জানিয়ে দিয়েছে। জানা গেছে, ভারত থেকে টিকা আনা এবং দেশে টিকা দেওয়ার সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার জন্য মঙ্গলবার ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটের নামে ৫০০ কোটি ৯ লাখ ৭৮ হাজার টাকা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে জমা দিয়েছে বাংলাদেশ। এর মাধ্যমে করোনার টিকার জন্য অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। প্রথম চালানের টিকা বাংলাদেশে আসার পর সিরাম ইনস্টিটিউট ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিতে পারবে। আর টিকা এলে বেক্সিমকোর টাকা পরিশোধ করা হবে।
অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার প্রতি ডোজের দাম পাঁচ ডলার। সেখান থেকে বেক্সিমকো এক ডলার পাবে। ভ্যাট, ট্যাক্স ও ট্রান্সফার ফি—সব বেক্সিমকো বহন করবে। সম্প্রতি ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটে উত্পাদিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার করোনা ভাইরাসের টিকা আমদানি ও জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশের ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর। এখন ভারত থেকে টিকার চালান পেলেই বড় আকারে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে পারবে সরকার, যা ভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে নতুন আশার আলো জ্বালবে। প্রসঙ্গত, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা মিলে করোনা ভাইরাসের যে টিকা তৈরি করেছে, তার উত্পাদন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সিরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার ৩ কোটি ডোজ কিনতে গত ৫ নভেম্বর সিরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশ সরকার। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি মাসে টিকার ৫০ লাখ ডোজ পাঠাবে সিরাম ইনস্টিটিউট। ভারত থেকে টিকা এনে বাংলাদেশে সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। বাংলাদেশে সিরাম ইনস্টিটিউটে উত্পাদিত ভ্যাকসিনের ‘এক্সক্লুসিভ ডিস্ট্রিবিউটর’ তারা।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি ফাইজারের তৈরি করা টিকা বাংলাদেশ নেবে কি না, তা জানতে চেয়ে চিঠি দিয়েছে বিশ্ব জুড়ে করোনা ভাইরাসের টিকা সরবরাহে গড়ে ওঠা প্ল্যাটফরম কোভ্যাক্স। তাদের চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ফাইজার-বায়োএনটেকের করোনা ভাইরাসের টিকা নিতে চাইলে ১৮ জানুয়ারির মধ্যে জানাতে হবে। কোভ্যাক্সের চিঠি শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে এসেছে। চিঠি আসার বিষয়টি স্বাস্থ্যমন্ত্রী, সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ কোভ্যাক্সের এই টিকা নেবে বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, গ্যাভি এবং সংক্রামক রোগের টিকা তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতামূলক সংস্থার (সিইপিআই) নেতৃত্বে করোনা ভাইরাসের টিকা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণের জন্য কোভ্যাক্স গড়ে উঠেছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী টিকা দিতে কোভ্যাক্সের এই চিঠি পাঠানোকে খুবই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, কোভ্যাক্সের এই চিঠি আমাদের জন্য খুবই ভালো খবর। কোভ্যাক্সের অঙ্গীকার অনুযায়ী টিকা সরবরাহ শুরু হয়েছে বলা চলে। তারা অল্প করে হলেও সবাইকে সমানভাবে টিকা বিতরণ করবে সেই নীতিমালা অনুযায়ী আমরা টিকা পাচ্ছি। কোভ্যাক্স থেকে টিকা এলে এর গুণাগুণ নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকবে না।
৬ জানুয়ারি বাংলাদেশসহ কোভ্যাক্স উদ্যোগের ১৯২টি সদস্য দেশকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। জানুয়ারির শেষ নাগাদ বা ফেব্রুয়ারিতে তাদের থেকে স্বল্পসংখ্যক টিকা দেওয়া হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সদস্য দেশগুলো টিকা নিতে আগ্রহী কি না, তা আগামী ১৮ জানুয়ারির মধ্যে কোভ্যাক্সকে জানাতে হবে। ১৯ থেকে ২৮ জানুয়ারির মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ বা গ্যাভি সংশ্লিষ্ট দেশের আগ্রহপত্র ও অবকাঠামো পরিস্থিতি মূল্যায়ন করবে। ২৯ জানুয়ারির মধ্যে টিকা বিতরণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করবে এবং সদস্য দেশগুলোকে জানিয়ে দেবে। আগামী মে মাসের মধ্যে এই টিকা প্রয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে জানুয়ারির মধ্যে দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ফাইজারের টিকার অনুমোদন করানোর শর্তের কথাও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ২ ডিসেম্বর বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্য ফাইজারের টিকা ব্যবহারের অনুমতি দেয়। এর পর যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে এই টিকা প্রয়োগ করা হচ্ছে। ধারণা থেকে বাস্তবে রূপ নিতে মাত্র ১০ মাস সময় লাগায় ফাইজার-বায়োএনটেকের এ প্রতিষেধকটিকে বিশ্বে এখন পর্যন্ত প্রচলিত সব টিকার মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বানানো টিকা বলা হচ্ছে। দশককাল সময় নিয়ে বানানো টিকাগুলোর মতোই এই টিকাও গবেষণার সব প্রয়োজনীয় ধাপ অতিক্রম করে। চূড়ান্ত ধাপের ট্রায়ালে টিকাটি করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে ৯৫ শতাংশ কার্যকর বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
