প্রকৃতির বিচারটা খুব কঠিন। এতটা কঠিন যেটা কঠিনের কঠিনকেও হার মানায়। সেটা দেখার জন্য প্রতীক্ষা করতে হয়। অনেকটা প্রতীক্ষা। যেখানে সময় এসে প্রকৃতির সঙ্গে দাঁড়িয়ে যায়। সে সময়টা এতটাই কঠিন হয় যা কঠিনকে ভেঙে খণ্ডিত বিখণ্ডিত করে দেয়। প্রকৃতির বিচারটা খুব নীরবে, নিঃশব্দে হয়। সব মানুষ সে বিচারের ফলাফলটা বুঝতে পারে না। প্রকৃতি সেটা মানুষকে সঙ্গে সঙ্গে বলতে চায় না। প্রকৃতি মানুষকে আগে তৈরি করে, সময়কে চেনাতে চেনাতে মানুষকে একটা শূন্যতার জায়গায় টেনে নিয়ে যায়। তারপর সময় সেটা মানুষকে একসময় জানিয়ে দেয়। তখন হয়তো সেটা ইতিহাস। কিংবা একখণ্ড মমি। পাপের মুখোশটা মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়, ধসে পড়ে জনপদের পরে জনপদ মানবিক মূল্যবোধ। পাপের পরিণতির আগে প্রকৃতি পাপীদের পরীক্ষা নেয়। সে পরীক্ষাটা মানুষের পরীক্ষার চেয়ে অনেক কঠিন হয়। সেটা জীবনের পরীক্ষা, যা তিলে তিলে পাপীদের আঘাত করে। অনুশোচনার কঠিন আগুনে দগ্ধ করে। প্রতিদিন তাদের পুড়িয়ে পুড়িয়ে তাদের বিশ্বাসঘাতকতার নগ্ন দেহটাকে তাদের সামনে ব্যবচ্ছেদ করে। এভাবে অনেক দিন ধরে প্রকৃতি তাদের অবিচারের বিচারটা করতে থাকে, যা একদিন চূড়ান্ত হয়। সেখানে মানুষের পৃথিবীর মতো আইন-আদালত থাকে না। পক্ষ-বিপক্ষ থাকে না। সেখানে ঠাঁই কংক্রিটের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে প্রকৃতি। ক্রমাগত বোবা কান্নাকে চেপে রাখা প্রকৃতি সরব হয়। প্রকৃতির অদৃশ্য মানসপটে ভেসে উঠে বিদীর্ণ মহাকাল।
বিশ্বাসঘাতকের কথা মনে পড়ল। লোকটার নাম খন্দকার মোশতাক। লোকটা মানুষ ছিল না, অমানুষ ছিল। একটার পর একটা মিথ্যা অভিনয় করে বঙ্গবন্ধুর ছায়া সহচর হয়ে ওঠে এই মানুষটি। অতিভক্তির কৌশলকে ব্যবহার করে বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাসভাজন হওয়ার নাটকটা মোশতাকদের মতো মানুষরাই ভালো জানে। কী অভিনয়টাই না করেছে লোকটা।! বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারকে হত্যার ষড়যন্ত্র করতে সেদিন তার বুকে কাঁপন ধরেনি। তবে প্রকৃতি সেদিন নিস্তব্ধ হয়েছিল, যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়েছিল। আছাড়ি-বিছাড়ি করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিল। সেদিনের ইতিহাসকে প্রকৃতি কখনো ভোলেনি। সময় প্রকৃতিকে সাহস দিয়েছে। প্রকৃতি মোশতাককে তার পাপ আর অপরাধের শাস্তি নিজ হাতে দিয়েছে। এত কিছুর পরও ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি মোশতাক। ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ৮৩ দিনের মাথায় ১৯৭৫ সালের ৫ নভেম্বর ক্ষমতাচ্যুত হয় সে। ৬ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে তাকে বন্দি করা হয়। খন্দকার মোশতাক ২১ বছর একরকম বাড়ির চার দেওয়ালে বন্দি ছিল। দুরারোগ্য রোগে ভুগতে ভুগতে ১৯৯৬ সালের ৫ মার্চ মারা যায় এই বিশ্বাসঘাতক। প্রকৃতি তাকে তিল তিল করে হত্যা করেছে। সবাই তাকে ছাড় দিলেও প্রকৃতির বিচার তাকে ছাড় দেয়নি। মার্কিন লেখক ও ঔপন্যাসিক মার্ক টোয়েন একটা কথা প্রায় বলতেন, ‘যদি তুমি রাস্তা থেকে কোনো ক্ষুধার্ত কুকুরকে বাড়িতে নিয়ে যাও এবং লালনপালন করো, তবে কুকুরটি কখনো তোমাকে কামড়াবে না। এটাই হলো মানুষ ও কুকুরের মধ্যে পার্থক্য।’ মার্ক টোয়েন প্রকৃতিকে খুব গভীর জীবনবোধ থেকে দেখেছিলেন, যা তাকে প্রকৃতির মতো ভাবতে শিখিয়েছে। মানুষ তো আর মানুষ নেই। মানুষের এখন দেশের প্রতি মায়া নেই। মমতা, ভালোবাসা নেই। মানুষ এখন প্রকৃতির মতো করে পৃথিবীকে দেখে না। মানুষ পৃথিবীকে দেখে তার স্বার্থের মতো করে। আপনজনের টান মানুষকে কাঁদায় না। কারণ মানুষ যে প্রকৃতির কাছে উদারতার শিক্ষাটা নিতে পারে না। সেটা নেওয়ার মতো যে একটা বড় মন থাকতে হয়, সেটাও তো মানুষের নেই। না আছে মানুষের বিবেক, না আছে আবেগ। সব যেন ভেঙেচুরে ওলটপালট হয়ে গেছে।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘আমি কী রকমভাবে বেঁচে আছি’ কবিতায় খুব গভীর বেদনাবোধ নিয়ে বলেছেন, ‘আমি মানুষের পায়ের কাছে কুকুর হয়ে বসে থাকি—তার ভেতরের কুকুরটা দেখব বলে।’ প্রকৃতি আমাদের মধ্যে এমন বোধশক্তি গড়ে তুলুক। প্রকৃতি এমন একটা শক্ত মাটির মতো মনের কাছে এসে দাঁড়াক। বদলে ফেলুক মানুষ। জাগিয়ে তুলুক মানবিক মূল্যবোধের শহর। যেখানে পাপ, পাপী, অপরাধ, অপরাধী সবটাই এক সমীকরণে এসে বলবে, ‘অশুভ চিন্তা হারিয়ে যাক, শুভ চিন্তা বেঁচে থাক।’ সব অপরাধ পাপ নয়, সব পাপ অপরাধ নয়। দর্শনটা যে কারো হতে পারে। তবে প্রকৃতির দর্শন আর চিন্তার হাতকে কখনো ছেড়ে দেওয়া ঠিক না। প্রকৃতি সব জানে, সব দেখে, সব বুঝে। প্রকৃতির বিচার কেউ এড়াতে পারে না।
n লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল
ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর
