বিধিমালা কি কেবল কিতাবে রহিয়াছে?

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২১, ২১:৩৬

নাগরিক জীবনযাপনে সিলিন্ডার গ্যাস এখন একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। রান্নার কাজে এলপিজি এবং বিভিন্ন যানবাহনে সিএনজি সিলিন্ডার ব্যবহার ব্যতীত একটি দিনও কল্পনা করা যায় না। কিন্তু সকল ক্ষেত্রেই অসাবধানতায় গ্যাসের চাপের হেরফের ঘটিলে বা লিকেজ থাকিলে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটিতে পারে। সিলিন্ডার গ্যাসের ভয়াবহ দুর্ঘটনার খবর প্রায়শই আমরা সংবাদপত্রে দেখিয়া থাকি। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে ইহা কি কেবল অজ্ঞতা ও অবহেলা? গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার কালামপুর এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হইয়া একই স্থানে চারটি কলোনিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়াছে। ইহাতে আগুনে দগ্ধ হইয়া স্বামী-স্ত্রীসহ চার জনের মৃত্যু হইয়াছে। এই নিদারণ মৃত্যু ছাড়াও দগ্ধ ও আহত হইয়াছেন অন্তত ২০ জন। ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় সূত্র জানাইয়াছে, ঐ এলাকার একটি কলোনির কক্ষে সিলিন্ডারের গ্যাস লিকেজ দেখা দিয়াছিল। ইহাতে কলোনির অন্য ভাড়াটিয়াদের গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করিতে নিষেধ করা হইলেও কেহ তাহা মানে নাই। তাহাতে যাহা হইবার তাহাই হইয়াছে।

গ্যাস সিলিন্ডার বাজারের একটি পণ্য বটে, কিন্তু এই পণ্য অসাবধানে, সিলিন্ডারের ত্রুটির কারণে কিংবা হঠাত্ ঘটা দুর্ঘটনায় গণবিধ্বংসী বোমার মতো ভয়ানক হইয়া যাইতে পারে। বিস্ফোরক পরিদপ্তর সূত্র বলিতেছে, এলপি গ্যাস বাতাসের চাইতে ভারী হইবার কারণে উড়িয়া যাইতে পারে না। সুতরাং বদ্ধ স্থানে লিকেজ হইলে গ্যাস বাহির হইয়া সিলিন্ডারের আশপাশেই জমিয়া থাকে। লিকেজের মাধ্যমে বাতাসের সহিত দুই ভাগ এলপিজির সংমিশ্রণ ঘটিবার পর তাহা অতি সামান্য আগুনের সংস্পর্শে আসিলেও বিস্ফোরণ ঘটিতে পারে। এলপিজি বিধিমালা, ২০০৪ অনুসারে, এলপিজি সিলিন্ডার কোনো দ্বিচক্রযানে পরিবহন করা যায় না। ইহা ছাড়া এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহে সাবধানতার সহিত উঠাইতে-নামাইতে হয়। সিএনজি কনভারশন কর্তৃপক্ষ হইতে জানা যায়, মূলত একটা সিলিন্ডারের মেয়াদ থাকে ১৫ বত্সর। কিন্তু প্রতি পাঁচ বত্সর পরপর আন্ডারগ্রাউন্ড স্টোরেজ ট্যাংকে ফেলিয়া ৩৫০ বার প্রেশার দেওয়া হয়। যদি ইহাতে টিকিয়া যায় তাহা হইলে পরবর্তী পাঁচ বত্সরের জন্য ব্যবহারের অনুমোদন পায়। ইহাই সকল ধরনের সিলিন্ডারের ক্ষেত্রে সার্বিক নিয়ম। সরকারের হইতেই এই নিয়ম করা হইয়াছে। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের আইন অনুযায়ী এবং তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বিধিমালা-২০০৪ (২০১৬ পর্যন্ত সংশোধিত) গেজেটে সিলিন্ডার গ্যাস পরিবহন-বিতরণ-সংরক্ষণ ও ব্যবহার লইয়া অসংখ্য নিয়ম ও বিধির কথা বলা হইয়াছে। সকল নিয়ম ও বিধি পড়িতে পড়িতে যে কাহারো মনে হইতে পারে, বাংলাদেশে এই যে লক্ষ লক্ষ গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করা হয়, ইহার মধ্যে কতজন ডিলার ও গ্যাস পরিবহনের সহিত যুক্ত ব্যক্তিবর্গ ইহার সামান্য অংশ জানেন? বাস্তবিক অর্থে, কেহই কিছুই জানেন না। সকলেই যেন খেয়ালখুশিমতো গ্যাস সিলিন্ডার গ্যাস পরিবহন-বিতরণ-সংরক্ষণ ও ব্যবহার করিয়া থাকেন। অর্থাত্ গ্যাস বিধিমালা কাজির গরুর মতো কিতাবে আছে বাস্তবে ইহার প্রয়োগ নাই বলিলেই চলে। অথচ আমাদের একটি বিস্ফোরক পরিদপ্তর রহিয়াছে। তাহারা কি কেবল কাগজে-কলমে নিয়ম ও বিধিমালা তৈরি করিয়াই সকল দায় সারিবেন? নচেত্ একটি গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ হয় কী করিয়া? লিকেজ হওয়া সিলিন্ডার কি মেয়াদ উত্তীর্ণ ছিল? কিংবা উহার অন্য কোনো ত্রুটি ছিল?

ভয়াবহ ব্যাপার হইল, মেয়াদ শেষ হওয়া সিলিন্ডার এক অর্থে টাইম বোমার মতোই দুর্ঘটনা ঘটাইতে পারে। সিলিন্ডারের গ্যাস খুব বেশি চাপে তরল করিয়া প্রবেশ করানো হয় বিধায় ইহার বিস্ফোরণও খুব ভয়াবহ হয়। এই বিস্ফোরণের ফলে যেই শক ওয়েভ ছড়াইয়া পড়ে তাহাতে নিকটবর্তী যে কাহারো শরীরের ব্যাপক ক্ষতি করিতে পারে। এমনকি প্রাণহানিও অস্বাভাবিক নহে। সুতরাং এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট পরিদপ্তরকে দায়িত্বশীল হইতেই হইবে।