অনন্যসাধারণ রহস্যময়ী তত্ত্ব

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২১, ২১:৩৭

স্মরণকাল থেকে জানা যায় যে, এ বিশ্বে ছোট-বড় মিলে ২৭টি সভ্যতার (যেমন—মিশরীয়, সুমেরীয়, ব্যাবিলনীয়, এসেবীয়, ক্যালডীয়, সিন্ধু, পারস্য, হিব্রু, ফিনিশীয়, চীন, গ্রিক, রোমান, ইত্যাদি সভ্যতা) (Civilisation)-এর উন্মেষ ঘটেছে এবং প্রত্যেকটি সভ্যতায় কিছু না কিছু আবিষ্কার হয়েছে। সত্যি কথা বলতে গেলে এই সমস্ত আবিষ্কার স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল না। কালের বিবর্তনে ও ব্যবধানে রিলে রেসের মতো একে অন্যের হাত ধরে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে এগিয়ে গিয়েছে। যাহোক, বর্তমানে চলমান অত্যাধুনিক সভ্যতারও সরণি ধরে বিভিন্ন আঙ্গিকে উল্লেখযোগ্য অনেক কিছু আবিষ্কার হয়েছে। তার মধ্যে প্রধান একটি হলো সিংগুলারিটি। আমরা স্কুলজীবনে ইংরেজি গ্রামার শেখার প্রাক্কালে বচন (Number) পড়েছি। এখানে ইংরেজিতে একবচন সিংগুলার (Singular) এবং বহুবচন হলো প্লুর্যাল (Plural)। হয়তো ভাবছেন সিংগুলারিটি সেই সিংগুলার শব্দ থেকে এসেছে। কিন্তু তা নয়। এক্ষেত্রে সিংগুলারিটির অর্থ ব্যাপক ও রহস্যময়। সিংগুলারিটির আভিধানিক অর্থ হলো ‘অনন্য সাধারণ রহস্যময়ী তত্ত্ব’। বস্তুত বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে কৃষ্ণগহ্বরের (Black hole) সঙ্গে সিংগুলারিটি কথাটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এদিকে পদার্থবিজ্ঞানমতে, আলোর কণার (Photon) কোনো ভর নেই। কিন্তু ভর না থাকলেও এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকল বস্তুর মধ্যে এর গতিবেগ সর্বোচ্চ অর্থাত্ সেকেন্ডে ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল। ভর নেই, অথচ গতিবেগ সর্বোচ্চ; এমন কিছুকে কোনো বস্তুই তার আকর্ষণে আটকে রাখার কথা নয়। কিন্তু মহাজাগতিক নিয়মে মাঝেমধ্যে কোনো কোনো নক্ষত্র ভরের দিক দিয়ে এতটাই বেশি হয়ে অত্যধিক ওজনে অবস্থান নেওয়ার কারণে ভীষণ ম্যাগনেটিক ফিল্ড সৃষ্টি হয়। সেই সময় আলোর কণা পর্যন্ত সেখানে আটকা পড়ে যায়। তখন এই অতি ভরসংবলিত নক্ষত্রকে কৃষ্ণগহ্বর (Black hole) বলে অভিহিত করা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই কৃষ্ণগহ্বরের বলয়সংবলিত মহাকাশে অভিকর্ষ বা মহাকর্ষ বল (Force) এবং একই সঙ্গে এর ঘনত্ব এত বেশি পরিমাণে থাকে যে, সেখানে কোনো আলোর কণা একবার গেলে তা আর কোনো দিকে বেরিয়ে আসতে পারে না। এ ধরনের বৈশিষ্ট্যের আদলে সমস্ত বস্তু একত্রে অতীব ঘনীভূত থাকার কারণে যে অবস্থা সৃষ্টি হয়, সেটাকে বৈজ্ঞানিকরা নাম দিয়েছেন সিংগুলারিটি। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, পদার্থবিজ্ঞানে এযাবত্ যত তত্ত্ব ও সূত্র প্রবর্তিত হয়েছে, তা বলতে গেলে এই সিংগুলারিটির ক্ষেত্রে পুরোপুরি অচল। কেননা সিংগুলারিটি এমন একটা অনুমিত বিন্দু (Hypothetical Point), যার আয়তন শূন্য; অথচ ভর ও ঘনত্ব অসীম। শুধু তা-ই নয়, এখানে সময় (Time) ও স্থান (Place) অসীমভাবে বেঁকে যায় বিধায় এখানে সময় বলে কিছু থাকে না। মূলত মহাজাগতিক নিয়মে কোনো তারকার সমুদয় ভর অত্যধিক মহাকর্ষের ফলে চুপসে তথা সংকুচিত হয়ে আয়তন শূন্য হয়ে গেলে সিংগুলারিটির উদ্ভব হয়। আর এটাকে মাথায় রেখে আধুনিক বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন যে, প্রতিটি কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্রই (Centre) হচ্ছে একেকটি সিংগুলারিটি, যেখানে বিদ্যমান থাকে শুধু তিনটি মাত্রা (Dimension) যেমন—দৈর্ঘ্য (Length), প্রস্থ (Breadth) এবং উচ্চতা (Height)।

এই আর্টিকেলটি আরো অর্থবহ করার জন্য সংগত কারণেই এর ইতিবৃত্ত সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করা সমীচীন বলে মনে করি। কৃষ্ণগহ্বরের আওতায় স্থান ও সময়ের বক্রতাসহ সিংগুলারিটি প্রথম তুলে ধরেন ১৯৩৯ সালে আমেরিকান পদার্থবিদ রবাট ওপেন হেইমার। কিন্তু তত্কালীন পদার্থবিদরা তার এ বিষয়টি হেসে উড়িয়ে দেন। তা ছাড়া এ ব্যাপারে তারা বলেন যে এই অদ্ভুত বিন্দুতে এমন অবস্থার যে সৃষ্টি হয়, তা কী করে সম্ভব? এটি পাগলের প্রলাপ বই কিছু নয়। তাই তখন কিছু দিনের মধ্যে এটি চাপা পড়ে যায়। এর মধ্যে ২০ বছর অতিক্রান্ত হয়ে যায় এবং ১৯৫৯ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য ছাত্র ডব্লিউ স্টিফেন হকিং এটির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি করার জন্য ভর্তি হন। তার থিসিস ছিল সাধারণ আপেক্ষিকতা ও কৃষ্ণগহ্বর। আর এই পিএইচডি করার ব্যাপারে তত্ত্বাবধানে ছিলেন ভেনিস শিয়ামা। এ সূত্র ধরে প্রথমে তিনি বিগ ব্যাংক (মহাবিস্ফোরণ) তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। কেননা এটি ছিল সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব (Theory of Relativity) ও কৃষ্ণ গহ্বরের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিছু দিন গবেষণার পর স্টিফেন হকিং জোর দিয়ে বলেন যে, আমাদের বর্তমান এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি হয়েছে অতীব ক্ষুদ্র একটি বিন্দু (Point) থেকে মহা বিস্ফোরণের মাধ্যমে। অবশ্য এটি ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়ে বর্তমান পর্যায়ে এসেছে এবং বস্তু (Matter) ও ঘূর্ণনের (Motion) ফলে চতুর্থ মাত্রা হিসেবে সময় (Time) যোগ হয়েছে। তিনি গাণিতিকভাবে হিসাবনিকাশপূর্বক অনুধাবন করেন যে কৃষ্ণগহ্বর শুধু আকারে বৃদ্ধি পাবে, কখনোই হ্রাস পেতে পারে না। তাছাড়া আরো বলেন যে, কোনো একটি সিংগুলারিটি বিন্দু থেকে মহাবিস্ফোরণের (Big Bank) মাধ্যমে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে।

n লেখক :গবেষক ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক