কোভিডের ভ্যাকসিন সংগ্রহ করিতে সামর্থ্য অনুযায়ী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এখন মরিয়া। কোন দেশ কত সহজে এই টিকা সংগ্রহ করিতে পারিবে তাহা নির্ভর করিতেছে দেশটির আর্থিক সামর্থ্য এবং কূটনৈতিক দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্কের উপর। ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত এক নিবন্ধের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদস্য ১৯৪টি দেশে করোনার দুইটি ডোজের টিকার জন্য প্রয়োজন হইবে দেড় হাজার কোটিরও অধিক ডোজের টিকা। এই হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন হইবে প্রায় সাড়ে ৩২ কোটি টিকা। অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন পাইতে গত ডিসেম্বরেই বাংলাদেশ চুক্তি সম্পন্ন করিয়াছে। তবে সম্প্রতি প্রশ্ন উঠিয়াছে যে, অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারদরের তুলনায় ৪৭ শতাংশ অধিক মূল্যে বাংলাদেশ ক্রয় করিতেছে। যদিও এই ক্ষেত্রে আমাদের অর্থমন্ত্রী বলিয়াছেন, ভারত ভ্যাকসিন তৈরি করিলে স্বাভাবিকভাবে ইহার উত্পাদন খরচ কম হইবে। অন্যদিকে তাহারা যখন বিক্রি করিবে তখন তাহাদের উত্পাদন খরচ, মুনাফা—দুইটিকে একত্র করিয়াই হিসাব করিবে। সুতরাং তাহাদের যেই খরচ হইবে সেই দামে আমরা ভ্যাকসিন পাইব—এমন প্রত্যাশা করা ঠিক হইবে না। মন্ত্রী মনে করিতেছেন, এই ক্ষেত্রে আমাদের দেখিতে হইবে, আন্তর্জাতিক বাজারে কত দামে ভ্যাকসিন বিক্রয় হইতেছে এবং আমরা কত দামে পাইতেছি। কোনো দেশ যদি অধিক মূল্যে ভ্যাকসিন বিক্রয় করিয়া থাকে সেই ক্ষেত্রে অন্য দেশ হইতেও করোনার ভ্যাকসিন ক্রয়ের চেষ্টা করিবার কথা জানাইয়াছেন অর্থমন্ত্রী। জানালা তো একটি নহে, অনেকগুলিই খোলা আছে। আমরা তাহার এই বাস্তবোচিত ও বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট পরিকল্পনায় সাধুবাদ জানাই। একই সঙ্গে আমরা আশাবাদ ব্যক্ত করিতেছি, বাংলাদেশ নিশ্চয়ই আন্তর্জাতিক বাজারদরেই ভ্যাকসিন সংগ্রহ করিতে পারিবে।
ব্রিটেনের মেডিক্যাল জার্নালের তথ্য হইতে জানা গিয়াছে, করোনার ২৭৩টি ভ্যাকসিন লইয়া গবেষণা চলিলেও মোট ১২টি কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন গবেষণার তৃতীয় ধাপ পার হইয়াছে। ইহাদের মধ্যে কয়েকটি ভ্যাকসিনের ৭০ হইতে ৯৫ শতাংশ কার্যকারিতা লক্ষ করা গিয়াছে। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী ছয়টি ভ্যাকসিনকে বিভিন্ন দেশের সরকার জনগণের উপর ব্যবহারের জন্য অনুমতি দিয়াছে। এইগুলি হইল—ফাইজার-বায়োএনটেক কোম্পানির তৈরি টোজিনামেরান, মডার্না কোম্পানির এমআরএনএ-১২৭৩, চীনা কোম্পানি সিনোফার্ম ও সিনোভ্যাকের দুইটি ভ্যাকসিন, রুশ কোম্পানি গামালেয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তৈরি একটি এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়-অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি একটি ভ্যাকসিন। আমরা পূর্বেই জানিয়াছি—এই সকল ভ্যাকসিন সকলের পূর্বে হাতে পাইতে ধনী দেশগুলি অনেক পূর্ব হইতেই আগাম বুকিং দিয়া রাখিয়াছে। যেহেতু এই টিকা তৈরির গবেষণা চালাইয়াছে ধনী দেশগুলি, সেই কারণে কার্যকর টিকা তৈরির পর এই দেশগুলিই স্বাভাবিকভাবেই প্রধানত নিজের নাগরিকদের সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিতেছে। স্পষ্টতই বিশ্বের প্রায় সকল উন্নয়নশীল দেশ প্রধানত এই সকল ধনী দেশের মুখাপেক্ষী হইয়া থাকিতেছে। তবে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশের সহিত বলিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দিয়াছেন।
মূলত একটি কার্যকর ভ্যাকসিন পাওয়াকেই উচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হইতেছে। ইতিমধ্যে ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনায় শতভাগ প্রস্তুতি গ্রহণ করা হইয়াছে। ইতিমধ্যে গত ২ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি অনুসরণ করিয়া কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন ক্রয়ে পিপিআর, ২০০৮-এর বিধি ৭৬ (২)-এ উল্লিখিত মূল্যসীমার ঊর্ধ্বে ক্রয়ের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে ভ্যাকসিন ক্রয়ের ক্ষেত্রে যাহাতে অর্থের নয়ছয় না হয় সেইদিকে প্রধানমন্ত্রী কঠোর নির্দেশ দিয়াছেন। আগামী ২৫ জানুয়ারির মধ্যে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট উত্পাদিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ‘কভিশিল্ড’ ভ্যাকসিনের প্রথম চালান দেশে পৌঁছাইবে বলিয়া আশা করা হইতেছে। করোনার টিকাদান কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য দ্বিতীয় দফায় গত বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুকূলে ৭১৯ কোটি ৩১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা ছাড়ও করিয়াছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। তবে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের চাইতে অধিক দামে ভ্যাকসিন ক্রয় করিলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হইবে। আশা করা যায় বর্তমান সরকার চৌকশের সহিত ইহার মোকাবিলা করিতে পারিবে।
