বিগত ১১ জুন ২০২০ সালে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী (২০২০-২০২১) অর্থবছরে যে বাজেট প্রস্তাব পেশ করেছিলেন তাতে বলা হয়েছিল দেশের প্রচলিত আইনে যা-ই থাকুক না কেন, ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আয়কর রিটার্নে অপ্রদর্শিত জমি, বিল্ডিং, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টের প্রতি বর্গমিটারের ওপর নির্দিষ্ট হারে এবং নগদ অর্থ, ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার, বন্ড বা যে কোনো সিকিউরিটিজের ওপর ১০ শতাংশ কর দিয়ে আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন করলে আয়কর কর্তৃপক্ষসহ অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না। অর্থমন্ত্রী আরো বলেছিলেন—একই সময় ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা পুঁজিবাজারে অর্থ বিনিয়োগ করলে, ঐ বিনিয়োগের ওপর ১০ শতাংশ কর দিলে, আয়করসহ কোনো কর্তৃপক্ষ প্রশ্ন করবে না। এর বাইরে বিনিয়োগ চাঙা করতে বিদায়ি অর্থবছর থেকে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দিয়ে আসছে সরকার। সেখানে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগকৃত অর্থের ১০ শতাংশ কর দিলেই এখন প্রশ্ন করবে না এনবিআর। ২০২৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত এই সুযোগ আছে। এখন পর্যন্ত কেউ হাইটেক পার্ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে কালোটাকা বিনিয়োগ করেননি বলে জানা গেছে। বিদায়ি অর্থবছরে ফ্ল্যাট কেনায়ও তেমন সাড়া পায়নি সরকার। এই সংখ্যা ছিল ১০০-এর মতো। এ পর্যন্ত দেশে ১৭ বার কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা সাদা হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি টাকা সাদা হয়েছে ২০০৭ ও ২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। ঐ সময় ৩২ হাজার ৫৫৮ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এই সুযোগ নিয়েছিল। তখন ৯ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা বৈধ করা হয়।
বাজেট ঘোষণায় ব্যবসাশিল্প ও আবাসন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে কালোটাকা সাদা করা অথবা অপ্রদর্শিত আয় প্রদর্শিত করার যে সুযোগের কথা বলা হয়েছে, তা বিগত সময়ের বাজেট ঘোষণাগুলোতে এমনভাবে আসেনি। সম্ভবত সরকার মনে করছে—এ সুযোগের ফলে অর্থ পাচার রোধ হবে এবং অর্থনীতির মূলধারায় বিনিয়োগ হলে যা প্রবৃদ্ধিকে (জিডিপি) ত্বরান্বিত করবে; যা কর্মসংস্থান তথা মাথাপিছু আয় বাড়ানোরও একটি মাধ্যম; কিন্তু এ ব্যাপারে ভিন্নমত রয়েছে অনেকের। যেমন এ প্রক্রিয়া অবৈধভাবে আয়-উপার্জন ও আয়কর ফাঁকিকে যেমন উত্সাহিত করবে অন্যদিকে বৈধপথে উপার্জনকারী নিয়মিত ও সত্ করদাতাকে নিরুত্সাহিত করবে, দুই দলের মধ্যে বৈষম্য বাড়াবে এবং অনৈতিক চর্চা প্রসারিত হবে; কিন্তু তাত্ত্বিকভাবে এ বিষয়টিকে অর্থনীতির চর্চায় তেমনভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, বিশেষত শিক্ষা কিংবা গবেষণাকার্যক্রম বিধায় এ বিষয়টিতে তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ লেখা অনেক ক্ষেত্রে চোখে পড়ে না। তাই প্রশ্ন স্বভাবতই আসে বিষয়টি কী? কালোটাকার একটা পরিচয় রয়েছে, যেমন—দেশের কর আইনে কালোটাকার সংজ্ঞা না থাকলেও অপ্রদর্শিত আয় কথাটি উল্লেখ আছে বিধায় যে ব্যক্তি তার আয়কর রিটার্নে তার আহরিত আয় প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয় সেই টাকাকেই কালোটাকা বলে ধরা হয়; যদিও এই আয় অবৈধ পথে নাও হতে পারে। এখন অনেকে বলছে অপ্রদর্শিত আয় দুই রকমের, যথা—(১) বৈধ অর্জন কিন্তু আয় রিটার্নে প্রদর্শিত হয়নি; (২) অবৈধ উপায়ে অর্জন; যার ওপর আয়কর দেওয়া হয়নি। এখন নির্দিষ্ট পরিমাণ কর জরিমানাসহ প্রদান সাপেক্ষে অর্থনীতির মূলধারায় কালোটাকাকে সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টাকে কালোটাকা সাদা করা বলা হয়। অর্থনৈতিক দর্শনে কালোটাকাকে বিভিন্নরূপে দেখানো হয়েছে। যেমন—ধূসর, নিমজ্জিত, অনানুষ্ঠানিক, সুপ্ত, সমান্তরাল ইত্যাদি। যার মূল উত্স অনৈতিকতার চাপে আবদ্ধ বিভিন্ন রূপে, যেমন—ঘুষ, মানুষ পাচার, স্বর্ণ পাচার, চাঁদাবাজি, জমি কেনাবেচার দালালি ইত্যাদি। যার গতিময়তা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেশি যা কোনো নিয়মের ছকে আবদ্ধ করা যায় না।
আয়কর আইনের ১৯(ই) ধারায় ৩(ঘ) উপধারা অনুযায়ী বেআইনি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মাধ্যমে অর্জিত আয় যথাযথ আয়কর এবং ১০ শতাংশ হারে জরিমানা দিয়ে টাকা সাদা করা যাবে না, যা নৈতিকতা ও সংবিধানে পরিপন্থি; যা সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে। কালোটাকা সাদাটাকা উভয়ই মানি সার্কুলেশনের অন্তর্ভুক্তি হলেও অর্থনীতিতে প্রথমটির প্রভাব নেতিবাচক; যা সরকারের হিসাবের মধ্যে থাকে না, বিশৃঙ্খল গতিতে চলতে থাকে, আর্থসামাজিক পথে ক্ষত সৃষ্টি করে; যা প্রকারান্তরে ব্যাস্টিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে অবক্ষয়ের রাস্তাকে প্রশস্ত করে। আবার এই কালোটাকা প্রচলিত আইনকে ফাঁকি দিয়ে জনপদে বিচরণ করে এবং ন্যায়সংগত শ্রমের চেয়ে প্রাপ্তি বেশি থাকায় এ টাকা ব্যয়ের সময় অর্থনীতির নিয়মকানুন মেনে চলা হয় না।
এখন মধ্যবিত্ত আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থানটা কী তা নিয়ে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কারণ বাজেট আসলেই এ বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের উক্তি করতে দেখা যায়। বিশেষত বিশ্লেষকদের কাছে যা ছদ্মবেশে বিষয়টি রয়েই যায়; যা কর্তৃপক্ষ সরাসরি বলতে বা ঘোষণায় কিছুটা রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গির আশ্রয় নেয়। কারণ বিষয়টি অনেকটা অনৈতিক দার্শনিক শাস্ত্রের মানদণ্ডে বিবেচিত। নোবেল বিজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ ড. অমর্ত্য কুমার সেন বলেছিলেন সভ্যতার গোড়া থেকে সাদা ও কালো পরস্পর হাত ধরাধরি করে আসছে; যা পৃথিবীর সব দেশেই কমবেশি রয়েছে একটি নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে, যেমন—পশ্চিমা বিশ্ব, মধ্যম আয়ের দেশ লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার কিছু দেশে যেখানে অফশোর হিসাব বলে একটি কার্যক্রম প্রচলতি আছে। যেখানে বিশেষায়িত অঞ্চলে কালোটাকা বিনিয়োগ করলে কোনো প্রশ্নের মোকাবিলা করতে হয় না; যা অর্থনীতিতে বিনিয়োগের একটি বৃহত্ অংশ দখল করে রয়েছে।
১৯৭১ সাল থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পরিচালিত রাষ্ট্রকাঠামোতে কালোটাকা সাদা করার বিতর্কটি ছিল না; কিন্তু পঁচাত্তরপরবর্তী সামরিক সরকারগুলো এ বিষয়টিকে নিয়ে আসে বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এবং বাজেটের আগে-পরে এ বিষয়টি হালে পানি পায় এই যুক্তিতে, যা জিডিপির একটি বড় অংশ; যা অর্থনীতির মূল ধারায় নিয়ে আসতে না পারলে উন্নয়ন অনেকাংশে ব্যাহত হবে। বাস্তবে দেখা গেল, এই প্রক্রিয়ায় খুব একটা সাড়া পাওয়া যায় না তিনটি কারণে— যথাক্রমে :প্রথমত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) হয়তো নির্ধারিত ২০ শতাংশ (১০ শতাংশ কর ও ১০ শতাংশ জরিমানা) নিয়ে আয়কর রিটার্নের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে কালোটাকা সাদা করার ব্যবস্থা করল কিন্তু ভয়টা হলো ভবিষ্যতে এই রেকর্ড ধরে কালোটাকার মালিক কোনো হয়রানির স্বীকার না হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ বিষয়টি নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো প্রকারে ঝামেলা করবে কি না এবং যদি করে তবে দেশের প্রচলিত আইনে তাকে শাস্তি পোহাতে হবে। কারণ দেশের প্রচলিত আইনে এর কোনো সুরক্ষার কথা বলা নেই; তৃতীয়ত সামাজিক মর্যাদার ভয় রয়েই গেছে। কারণ বাংলাদেশের রক্ষণশীল সমাজে কালোটাকার মালিক যদি আয়কর রিটার্নের মাধ্যমে কোনো মামলায় জড়ায় তবে তা বংশপরম্পরায় যাতনা বইতে হবে; যা মানসিক অশান্তির কারণ হতে পারে। এখন আসা যাক অর্থনীতিতে কালোটাকার পরিমাণ কত এবং এখন পর্যন্ত কত টাকা সাদা করা হয়েছে এই হিসাবে। বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২০১১ সালের গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী দেখা যায় যে, ২০০৯ সালে অর্থনীতিতে ৬২ দশমিক ২ শতাংশ কালোটাকা ছিল, যার পরিমাণ ৫ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা; যা সম্প্রতি ঘোষিত বাজেটের চেয়েও বেশি। বাংলাদেশে ১৯৭৫ পরবর্তী সময় থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৩ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা সাদা করা হয়েছে এবং সরকারের রাজস্ব আদায় হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা; যার জন্য এ সুযোগটা রাখা হয়েছে ঘোষিত-অঘোষিতভাবে। এখন প্রশ্ন থাকে—এই আদায়কৃত কত টাকা শর্তমতে উত্পাদন খাতে ব্যয়িত হয়েছে?
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, দেশে অপ্রদর্শিত কালোটাকার পরিমাণ ৭ লাখ হাজার কোটি টাকার ওপরে; যার কোনো প্রভাব দৃশ্যত অর্থনীতিতে দেখা যাচ্ছে না। এই কালোটাকার উপস্থিতির কারণে অর্থনীতিতে অনেক সমস্যা দৃশ্যমান, তা হলো—(১) ধনী-গরিবের আয়ের বৈষম্য সৃষ্টি; (২) দ্বৈত অর্থনীতি (কালো বনাম সাদা); (৩) জাতীয় আয়ে তত্ত্ব বিভ্রাট; (৪) সরকার কর্তৃক রাজস্ব হারানো; (৫) সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ভাটা; (৬) বাহুল্য ব্যয় বৃদ্ধি; (৭) দুষ্প্রাপ্য সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ যা বাজারব্যবস্থায় মূল্য বাড়ায়; (৮) সমাজের নৈতিক মানদণ্ড নষ্ট হয়; (৯) উত্পাদনব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ইত্যাদি যার সমাধানকল্পে একটি স্বল্প-দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন; যা বাজেট বক্তৃতায় তেমন উল্লেখিত হয়নি। তবে দীর্ঘমেয়াদি কালোটাকার অনুশীলন কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়; যা এখন থেকেই সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন—প্রখ্যাত জার্মান অর্থনীতিবিদ ডেভিড মোরিলের বক্তব্যের আলোকে কালোটাকার পরিমাণ নির্ধারণসহ বাহকদের চিহ্নিত করতে হবে; যাতে অর্থনীতির অনুকূলে ইতিবাচক কার্যক্রম নেওয়ার পথ সুগম হয়; দ্বিতীয়ত প্রখ্যাত আরো এক সমাজ বিশ্লেষক কার্ল মার্কসের উক্তি হলো—কালোটাকা ছাড়া কোনো পুঁজি গঠিত হয় না এবং তা যদি সত্য হয়, তা হলে দেশের ভেতরে যে কালোটাকা রয়েছে তা দিয়ে গঠিত পুঁজি দেশের বড় বড় খাতের বিনিয়োগের মাধ্যমে উন্নয়ন ঘটাতে হবে, যার ফলে বিদেশি নির্ভরতা কমবে; তৃতীয়ত দেশের ভেতরে কালোটাকার উত্পাদনের ক্ষেত্রগুলো বন্ধ করতে হবে ক্রমান্বয়ে। কাজটি যেহেতু অপ্রদর্শিত অর্থনীতির অংশ, তাই এর প্রশাসনিক কাঠামো এমন হওয়া উচিত যেখানে অবৈধভাবে যেন অর্থ উপার্জনের সুযোগ না থাকে। একজন দার্শনিক বলেছিলেন—কেহ যদি বিপুল সম্পদের মালিক হয় তা রক্ষার জন্য পাহারাদার রাখতে হবে, সে যদি জ্ঞানের মালিক হয় তবে এই জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েই তার জীবন রক্ষা হবে, যার জন্য কোনো বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হবে না। সর্বশেষে বলা যায়, এই কালোটাকা নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষায় সময় ব্যয় না করে এর একটি স্থায়ী সমাধানের দিকে যাওয়া উচিত; যার দিকে নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ দিতে হবে।
n লেখক :অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ডিন, সিটি ইউনির্ভাসিটি
