পৌরসভা নির্বাচনে ৩০টি আসনেই জামানত হারিয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। বিপরীতে বিপুল বিজয়ের মধ্যেও একটি পৌরসভায় নৌকার প্রার্থী জামানত হারিয়েছেন। দ্বিতীয় ধাপের ৬০ পৌরসভার নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মোট প্রদত্ত ভোটের ৬০ শতাংশই পড়েছে নৌকায় আর ধানের শীষে পড়েছে ১৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। মেয়র পদে গড়ে ভোট পড়েছে ৬১ দশশিক ৯২ শতাংশ। এর মধ্যে ইভিএমে সর্বোচ্চ ভোট পড়েছে ৮৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং ব্যালটে সর্বোচ্চ ভোট পড়েছে ৮৫ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। তবে গত ২৮ ডিসেম্বরের প্রথম ধাপের ২৪ পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে ৬৫ শতাংশ ভোট পড়েছিল।
নির্বাচন বিশ্লেষকেরা বলছেন, সাধারণত স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে ভোটের হার বেশি হয়। তবে প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের পৌরসভা নির্বাচনে ভোটের যে হার ও ফলাফল, তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিশ্লেষকদের কারো কারো সন্দেহ রয়েছে। কেননা, সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন নির্বাচনের তুলনায় প্রথম ধাপের পৌরসভা নির্বাচনে ভোটের হার বেড়েছে। বিশেষ করে কয়েকটি পৌরসভায় প্রদত্ত ভোটে অস্বাভাবিকতা পাওয়া গেছে, যা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে।
ইসির সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা জামানত হিসেবে জমা দিতে হয়। পৌরসভায় ভোটার সংখ্যা অনুপাতে সর্বনিম্ন ১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা জামানত হিসেবে মেয়র পদপ্রার্থীদের জমা দিতে হয়। মোট প্রদত্ত ভোটের ৮ ভাগের ১ ভাগ ভোট যদি কোনো প্রার্থী না পান, তাহলে তার জামানতের টাকা বাজেয়াপ্ত করা হয়।
যেসব পৌরসভায় বিএনপির প্রার্থীরা জামানত হারিয়েছেন, সেগুলো হলো—দিনাজপুরের বিরামপুর ও বীরগঞ্জ; কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী; গাইবান্ধা সদর ও সুন্দরগঞ্জ; বগুড়ার সারিয়াকান্দি; রাজশাহীর ভবানীগঞ্জ ও আড়ানী; নাটোরের গোপালপুর ও গুরুদাসপুর; সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া; নরসিংদীর বেলকুচি ও রায়গঞ্জ; পাবনার ঈশ্বরদী; মেহেরপুরের গাংনী; কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা, মিরপুর ও শৈলকূপা; বাগেরহাটের মোংলা পোর্ট; মাগুরা সদর; নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ; ঢাকার সাভার; নরসিংদীর মনোহরদী; শরীয়তপুর সদর; সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর; মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ ও কুলাউড়া; ফেনীর দাগনভূঞা; চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ ও বান্দরবানের লামা। আওয়ামী লীগ জামানত হারিয়েছে হবিগঞ্জের মাধবপুরে। এর আগে প্রথম ধাপের ১২টি পৌরসভায় জামানত হারিয়েছিল বিএনপি।
দ্বিতীয় ধাপে ৬০ পৌরসভায় বেসরকারি ফলাফলে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ৬০ পৌরসভায় আওয়ামী লীগের মোট মেয়র হয়েছেন ৪৫ জন। এর মধ্যে ৪১ জন ভোটে এবং চার জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। কিশোরগঞ্জ সদরের একটি কেন্দ্র স্থগিত থাকায় ফলাফল নির্ধারিত হয়নি। তবে সেখানে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এগিয়ে আছেন। এছাড়া বিএনপির মেয়র হয়েছেন চার জন। স্বতন্ত্র মেয়র হয়েছেন আট জন; এর মধ্যে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী ছয় জন এবং বিএনপির দুই জন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। আর জাতীয় পার্টি-জাপার এক জন ও জাসদের এক জন মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। শনিবার ৬০ পৌরসভা নির্বাচনের মধ্যে ২৯টিতে ইভিএম ও ৩১ পৌরসভায় ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহণ হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ পরিচালক যুগ্ম-সচিব এস এম আসাদুজ্জামান জানান, এ ধাপে ২০ লাখ ৯১ হাজার ৬৮১ ভোটের মধ্যে ১২ লাখ ৯৫ হাজার ২৩৬টি ভোট পড়েছে। সে হিসাবে ভোটের হার হচ্ছে ৬১ দশমিক ৯২ শতাংশ।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নির্বাচনে ব্যালটে সর্বোচ্চ ৮৫ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ ভোট পড়েছে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ পৌরসভায়। দ্বিতীয় ধাপের ব্যালটে সর্বনিম্ন ভোট পড়েছে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে—৫৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। আর ইভিএমে সর্বোচ্চ ভোট পড়েছে রাজশাহীর কাকনহাট পৌরসভায়—৮৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ। আর সর্বনিম্ন ইভিএমে ভোট পড়েছে সাভার পৌসভায়—৩৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
ভোট শেষে ইসির সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর বলেছিলেন, সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত ভালো ছিল। প্রচুর ভোটার উপস্থিতি ছিল। দুয়েকটি জায়গায় দুষ্কৃতকারীরা অপচেষ্টা করেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে; এটা খুবই নগণ্য ঘটনা। সব মিলিয়ে এবার সুষ্ঠু ও একটা সুন্দর নির্বাচন হয়েছে।
দ্বিতীয় ধাপে অর্ধেক এলাকায় ভোটে ‘জোর-জবরদস্তিসহ’ বেশ কিছু অভিযোগে ওঠে। গাইবান্ধায় ভোট শেষে ব্যালট পেপার ও সরঞ্জাম নিয়ে ফেরত আসার সময় পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। সিরাজগঞ্জ পৌরসভায় ফল ঘোষণার পর দুই পক্ষের সংঘর্ষে কাউন্সিলর পদে বিজয়ী একজন নিহত হন। সহিংসতা বাড়ায় নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
গত ২৮ ডিসেম্বর প্রথম ধাপে ২৪ পৌরসভায় মেয়র পদে ৬৫ শতাংশ ভোট পড়ে। তাতে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকার প্রার্থীদের মধ্যে ১৮ জন, বিএনপির ধানের শীষের দুই জন এবং তিন জন স্বতন্ত্র প্রার্থী মেয়র পদে বিজয়ী হন। তৃতীয় ধাপে ৩০ জানুয়ারি ও চতুর্থ ধাপে ১৪ ফেব্রুয়ারি ভোট রয়েছে পৌরসভায়।
