স্রেফ খেতে না পেয়ে প্রতি তিন সেকেন্ডে প্রাণ যাচ্ছে একটি শিশুর; দিনে ১০ সহস্রাধিক। পুঁজিবাদ, জাতিবাদ আর দুঃশাসনের কান্ডারিদের করায়ত্ত তো পুরো পৃথিবীই। তাহলে এর একপাশে খাদ্যের উদ্বৃত্ত, অঢেল অপচয় এবং অন্য পাশে খাদ্যাভাবে মৃত্যুর খতিয়ানের কোনোটিরই দায় কি তারা এড়াতে পারেন? আরো সহজ করে বললে, এই একচোখা নীতি, অর্থনৈতিক লোভের ফাঁদ পাতা ভুবনে বিভাজনের গ্রেট গেমের খেলোয়াড় তারাই। তাদের প্রসব করা অসম বিশ্বায়ন ও মুনাফাবাদী বিশ্বব্যবস্থার বেরহমি বৈষম্যে ধুঁকছে দুনিয়া। যাকে সেই পুরোনো কথায় এভাবেও ব্যক্ত করা যায়, রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয় উলুখাগড়ার প্রাণ যায়।
এক রাজার বিরুদ্ধে অন্য রাজার দেওয়া সহজতম চালটির উদাহরণ যুদ্ধ; দেশে দেশে জিইয়ে রাখা দাঙ্গা-ফ্যাসাদ। এতে সাধারণ মানুষের ভূমিকা নেই এতটুকুও, রাখার উপায়ও নেই; অথচ জানমাল দিয়ে এর ষোলোআনা মাশুল দিতে হয় তাদেরই। যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে প্রতিদিন প্রাণ যাচ্ছে প্রায় ৩০০ শিশুর। জন্মভিটা, খেলার মাঠ, স্কুলে আঙিনা, খেলার সাথি হারিয়ে পরিবারের অন্যান্য সদস্য বা স্বজনের সঙ্গে কোনোরকমে প্রাণ নিয়ে পালাতে পারে যারা, তাদের ঠাঁই হয় কোনো এক শরণার্থী শিবিরে। যেখানে জীবন জিইয়ে না, কোনোরকমে প্রাণের ধুকপুকি চালু থাকে কেবল। ক্ষুধার তীব্র অভিঘাত, অনিশ্চিত ভবিষ্যত্। অপুষ্টিতে ভোগা নিরক্ষর নতুন প্রজন্ম তৈরির সব বন্দোবস্ত সেখানে বহাল।
পাঁচ বছর ধরে যুদ্ধের অন্ধকূপে পতিত এক ইয়েমেনেই এখন ৮০ শতাংশ মানুষ বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা ত্রাণ। আধপেটা খেয়ে বা না খেয়ে দিন পার। ঘরে ঘরে ধুঁকছে অবুঝ শিশুরা। পাঁজর বের হওয়া, অপুষ্ট, বস্ফািরিত চোখের লিকলিকে শিশুরা কাতারে কাতারে শুয়ে হাসপাতালে হাসপাতালে। জাতিসংঘের হিসাবেই দেশটিতে প্রতি পাঁচটি শিশুর একটি অপুষ্টির শিকার। কাজ নেই, অর্থ নেই, চিকিত্সা নেই, খাবার নেই। আছে যখন-তখন অপঘাত মৃত্যু, অন্ধকার ভবিষ্যত্। গত নভেম্বরেই জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিয়ো গুতেরেস সতর্ক করে বললেন, ‘ইয়েমেনে ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ আসতে চলেছে। গত কয়েক দশকে যা পৃথিবীর মানুষ দেখেনি। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হবে।’ কে পদক্ষেপ নেবে?
সিরিয়ার অবস্থা আরো করুণ। দশকব্যাপী যুদ্ধে দেশটি আক্ষরিক অর্থেই এতটাই ঝাঁজরা হয়ে পড়েছে যে পা ফেলার সমতল এতটুকু জায়গাও অবশিষ্ট নেই আর! বোমার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত ভূমি, গুঁড়িয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি, বিনাশিত প্রকৃতি। লাখে লাখে দেশ ছাড়ার পর, হাজারে-বিজারে মরার পর সিরিয়াকে শ্মশান উপমায় বেমানান বলা যায় কি? তবু আকাশে বোমারু বিমানের দাপাদাপি, মাটিতে ট্যাংকের আস্ফাালন, ক্ষেপণাস্ত্রের বিনাশী আঘাত আর বোমার মুহুর্মুহু বিস্ফোরণ সেই শ্মশানের নিত্যদিনের দিনলিপি।
এই যুদ্ধদিনের লিপিকারদের দূরদর্শিতা লা-জবাব। যেখানে অস্ত্রের আঘাতে সব লন্ডভন্ড করা সম্ভব নয়, সেখানে ভাতে-পানিতে মারার বন্দোবস্ত অটুট রাখেন তারা। আফ্রিকান চাইল্ড পলিসি ফোরাম বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটা সত্ত্বেও আফ্রিকার প্রায় ৬ কোটি শিশুর পাতে ঠিকঠাক খাবার জোটে না। পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য, বিশ্বের অন্যান্য অংশে শিশুর অনাহার পরিস্থিতির অল্পবিস্তর উন্নতি ঘটছে বটে, আফ্রিকার অনেক জায়গায় তা আরো খারাপে গড়াচ্ছে। প্রশ্নটা রাজনৈতিক সদিচ্ছার বললে বাড়িয়ে বলা হয় না।
আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে বড় ভিলেন কোভিড-১৯-এর প্রকোপের আগে বিশ্বে ১৫ কোটি মানুষ ছিল তীব্রভাবে খাদ্যনিরাপত্তাহীন, এখন সেই সংখ্যা ঠেকেছে প্রায় ২৭ কোটিতে। এই ১২ কোটির বাড়বৃদ্ধির দায় করোনার ঘাড়ে চাপানো যায় বটে, করোনার ঘাড় চেপে ধরার ব্যর্থতার দায় কিন্তু রাজরাজড়ারই।
গেল বছরটা এক কোভিডের কারণেই অন্য বছরের থেকে আলাদা হয়ে সময়ের খাতায় জায়গা করে নিয়েছে। প্রাণ গেছে ১৭ লাখ মানুষের। রুটি-রুজি হারিয়ে খাদ্যাভাবে আরো কয়েক কোটি মানুষের দিন কাটছে ভীষণ কষ্টে। কিন্তু তাই বলে এমন শোচনীয় মানবিক দুর্গতির সময়েও কি আকাশে ওড়েনি যুদ্ধবিমান, গোলা ছোড়া হয়নি ট্যাংক থেকে কিংবা বিস্ফোরণ ঘটেনি বোমার? খাদ্যাভাবে ১০ সহস্রাধিক শিশুসহ দৈনিক ২৫ হাজার মৃত্যু কি থেমে ছিল? আর কনোরার কারণও যে প্রকৃতির প্রাণ চেপে ধরা দানবীয় উন্নয়ন, তার আলামতও তো স্পষ্টই। সুতরাং দায় কার, এর উত্তর কি আর কারো অজানা?
বিশ্বব্যাপী সাড়ে ৮৫ কোটি মানুষ অপুষ্টির শিকার। আর উচ্চমূল্যের খাদ্যদ্রব্য কেনার সামর্থ্য না থাকায় আরো ১০ কোটি মানুষ ক্ষুধায় কাতরায়। প্রাকৃতিক বা সামাজিক বিপর্যয় তথা পরিকল্পিত যুদ্ধবিগ্রহ ও ক্ষুধা একে অপরকে কতটা ত্বরান্বিত করে, তার পুরোনো সাক্ষী বিশ্ব। করোনায় ঘায়ে এই ‘বুড়ো’ সাক্ষীর ঘুম কি ভাঙল?
n লেখক :সাংবাদিক
