ইরান-পাকিস্তান-তুরস্কের নতুন সামরিকায়ন

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২১, ২১:৪৬

নতুন দশকের সূচনায় অর্থাত্ ২০২১ সালে সামরিকায়নের দিক থেকে যেসব নতুনত্ব আনতে যাচ্ছে তুরস্ক-ইরান-পাকিস্তান এবং সেগুলো তাদের শত্রু ও মিত্রদের জন্য কী বার্তা দিচ্ছে!

গত ২০১৭ সালে আঙ্কারার সঙ্গে আড়াই শ কোটি ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করে মস্কো। চুক্তি অনুযায়ী মস্কো গত বছর এস-৪০০-এর সব সরঞ্জাম হস্তান্তর করে তুরস্কের কাছে। এর ধারাবাহিকতা এবারও বজায় রাখছে তারা। চলতি বছরে আবারও নতুন করে আকাশ প্রতিরক্ষা এস-৪০০ কিনবে বলে মস্কোর প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছে আঙ্কারা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করে নতুনভাবে তুরস্ককে আরো আধুনিক ও প্রতিরক্ষা খাতে অধিক শক্তিশালী করার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান এবং তা রাশিয়া থেকে এস-৪০০ কেনার মাধ্যমে; তবে তা শর্তসাপেক্ষে। কিন্তু কী হতে পারে সেই শর্ত? তুরস্কের জাতীয় প্রতিরক্ষা প্রধান ইসমাইল দেমির জানিয়েছেন, তারা রাশিয়া থেকে এস-৪০০ নতুনভাবে কিনবে এবং এক্ষেত্রে শর্ত হলো ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাবস্থা নির্মাণ করতে হবে যৌথভাবে এবং একই সঙ্গে এর প্রযুক্তিও আঙ্কারাকে দিতে হবে।

এখন দেখার বিষয় রাশিয়া সেই শর্তে রাজি হয় কি না; তবে এক্ষেত্রে রাশিয়ার মনোভাব স্পষ্ট নয়। গত বছর তুরস্ককে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ব্যাপক চাপ সহ্য করতে হয়েছে রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ কেনার কারণে। এই চাপকে উপেক্ষা করে নতুন করে নিজেদের সামরিকায়নকে আরো বেগবান করার জন্য নতুন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে দেশটি।

এই মুহূর্তে ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় তুরস্কের ক্রমবর্ধমান যে প্রভাব রয়েছে, এতে ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় ও ককেশাশ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়তে তুরস্কের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে রাশিয়া। এর মধ্যেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারে তুরস্ক রাশিয়াকে ব্যাপক অর্থ দিয়েছে এবং নতুন করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তাছাড়া আজারবাইজান-আর্মেনিয়া যুদ্ধের মাধ্যমে তুরস্ক-রাশিয়ার যৌথ কিছু কার্যক্রম লক্ষ্য করা গিয়েছে। এসব প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে এন্টি আমেরিকান পলিসি (Anti American policy)-র বিবেচনায় এটি বলা যায় যে, রাশিয়া তুরস্কের দেওয়া শর্তে আংশিক অথবা পুরোপুরি রাজি হতে পারে। আর যদি তা-ই হয়, তাহলে তুরস্ক প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় নিশ্চিতভাবে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে। সামরিকায়নের ক্ষেত্রে বিশ্বরাজনীতিতে নতুন যেসব বিষয়ের উদ্ভব হচ্ছে, তন্মধ্যে ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি অন্যতম। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র বাবর ইফতেখার জানিয়েছেন, সন্ত্রাস দমনে এবং ইরানের অপহূত সীমান্তরক্ষী তিন সদস্যকে উদ্ধারে সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াবে ইসলামাবাদ। এছাড়া তিনি পাশ্চাত্যের ইন্ধনে পাকিস্তানে আইএসসহ অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সংগঠিত হচ্ছে বলে দাবি করেন এবং একইসঙ্গে এসব ঘটনার পরিণতির ব্যাপারেও হুঁশিয়ার করেন। উল্লেখ্য, পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের সঙ্গে ইরানের সীমান্ত রয়েছে, যার অন্য পাশে রয়েছে আরব সাগর। সীমান্তটির আয়তন রয়েছে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার (আন্তর্জাতিক ম্যাপ অনুযায়ী ৯৬০ কিলোমিটার), এই সীমান্তের এক পাশে রয়েছে আফগানিস্তান, অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে ভারতের। যার কারণে ইরান থেকে কোনো কিছু আনতে কিংবা যোগাযোগ রক্ষা করতে ভারতকে ব্যবহার করতে হয় পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের কিছু অংশ। একই সঙ্গে আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০০১ সাল থেকে যেভাবে বসে আছে, তাতে ইরান ও পাকিস্তানের সম্পর্ক অনেকটাই প্রভাবিত হয়েছে। এখন দুটি দেশ যদি তাদের সামরিক সহযোগিতা আরো জোরদার করে, যেটি ইতিমধ্যে তারা ঘোষণা দিয়েছে, তাহলে তা হবে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। একই সঙ্গে ইরান তার অবস্থান আরো শক্তিশালী করতে পারবে। কারণ, পাকিস্তান পারমাণবিক বোমার অধিকারী রাষ্ট্র। ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার ভালো সম্পর্ক রয়েছে, তুরস্কের সঙ্গেও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান, চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সীমান্ত রয়েছে, একই সঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানেরও সীমান্ত রয়েছে। অর্থাত্ সীমান্তগত দিক থেকে ইরান-পাকিস্তান-চীন একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। আবার মালদ্বীপ অনেকটাই চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সুতরাং এখানে বেশ কয়েকটি সমীকরণ রয়েছে। সার্বিক দিক বিবেচনা করলে দেখা যাবে, এখানে ভারতবিরোধী একটি ব্লক তৈরি হচ্ছে।

তবে শেষ কথা হলো, এসব আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক খেলার পরিণতি যুদ্ধ এবং এর মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া, প্রাণহানি, শান্তি বিনষ্ট করা, মানুষের গৃহহীনতা এবং অভিবাসন সমস্যা সৃষ্টি, মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ঘটে, যা বিশ্ববাসী দেখতে চায় না। একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ বিশ্ব প্রতিষ্ঠিত হোক সেই প্রত্যাশাই সবার।

n লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়