শতবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমাদের সব ধরনের বাধা অতিক্রম করে যেতে হবে। আর এর জন্য প্রয়োজন গবেষণা করা। গবেষণা ছাড়া কোনো অর্জন সম্ভব নয়।’
গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উপলক্ষ্যে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সেমিনারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত এই সেমিনার গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে দেখলাম গবেষণার জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়, প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মতো যেটুকু পেত, তা দিয়ে চলত। কিন্তু গবেষণার জন্য আলাদাভাবে যে একটা সুযোগ সৃষ্টি করা হতো, তা কিন্তু হতো না। আমরা প্রথম শুরু করলাম আলাদাভাবে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে গবেষণাকে গুরুত্ব দিতে, যার ফসল আজকে বাংলাদেশ পাচ্ছে। আজকে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করছে, প্রতিটি ক্ষেত্রে যে এগিয়ে যাচ্ছে, ডিজিটাল বাংলাদেশ যে গড়ে তুলেছি, তার সবই গবেষণার ফসল। গবেষণাকে তাই সব সময় গুরুত্ব দিতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘ইতিমধ্যে করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন আমরা ভারত থেকে উপহারস্বরূপ পেয়েছি। এজন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ধন্যবাদ জানাই। আর আমরা যেটা টাকা দিয়ে কিনেছি, সেটা (জানুয়ারির) ২৫-২৬ তারিখের মধ্যে এসে পৌঁছাবে। কাজেই আমরা এ ব্যাপারে কীভাবে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে সেসব পরিকল্পনা নিয়ে রেখেছি। অর্থাত্, এই করোনা মোকাবিলায় সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছি।’
বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেও এগিয়ে যেতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষে আমরা চাই প্রতিষ্ঠানটি তার পুরোনো গৌরব ফিরে পাক। এখানে জ্ঞানের চর্চা হবে, গবেষণা হবে, শিক্ষার প্রসার ঘটবে। আমাদের সব অর্জনের বাতিঘর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলো ছড়িয়ে পড়বে সারা বাংলাদেশে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে স্কুল প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছি। সেই সঙ্গে প্রতিটি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয়ও করে দিয়েছি। বিভিন্ন ধরনের বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় আমরা তৈরি করে দিচ্ছি, যেটা আমি ১৯৯৬ সালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রথম শুরু করেছিলাম। এখন তো আমরা বহুমুখী বিশ্ববিদ্যালয় করে দিচ্ছি। আমি চাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সব সময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।’
তিনি বলেন, ‘আগামী দিনে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য আমাদের দক্ষ মানবশক্তি দরকার। এই দক্ষ মানবশক্তি গড়তে পারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এখান থেকে যাত্রাটা শুরু হতে পারে, যাকে অনুসরণ করবে সমগ্র বাংলাদেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ব যখন এগিয়ে যাবে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা যাতে চলতে পারি, সেভাবেই আমাদের এগিয়ে যাওয়ার দিশা দিতে পারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।’
তিনি বলেন, ‘ক্ষমতায় আসার পর আমাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশ ঠিক করা, শিক্ষার মান উন্নত করা। কারণ জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল, বাংলাদেশের মানুষ একটি সুন্দর জীবন পাবে, উন্নত ভবিষ্যত্ পাবে, ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত একটি বাংলাদেশ পাবে। কিন্তু একটি শিক্ষিত জাতি ছাড়া এটি কখনোই সম্ভব নয়। তাই শিক্ষাকে আমরা সব সময় গুরুত্ব দিয়ে থাকি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বঙ্গবন্ধুর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে প্রধানমন্ত্রী ধন্যবাদ জানান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা পাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশে উচ্চশিক্ষা বিস্তার নিশ্চিত হয়েছে। এখন প্রয়োজন এর গুণমান নিশ্চিত করা। শিক্ষা ও গবেষণার দিক থেকে বৈশ্বিক মানের বিবেচনায় আমরা এখনো কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারিনি। এটিকে উত্তরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেই দায়িত্ব নিতে হবে।’
সভাপতির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপমহাদেশের শিক্ষা ও গবেষণায় বিশেষ অবদান রেখে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক মূল্যবোধ উত্পাদন, লালন ও সম্প্রসারণ ঘটেছে। জাতিরাষ্ট্র গঠন ও বিনির্মাণে এর অনন্য ভূমিকা একে বিশ্বের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে আলাদা করেছে।
অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ পাঠ করেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান। উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন এবং উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ প্রধানমন্ত্রীর কৃতিত্ব তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন।
জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রতি মাসে একটি করে মোট ছয়টি ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হবে। চলতি মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা; ফেব্রুয়ারি মাসে সমাজের জন্য বিজ্ঞান; মার্চে কলা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি; এপ্রিলে টেকসই বাণিজ্য, মে মাসে জীবন ও জীবিকার জন্য সামাজিক বিজ্ঞান এবং জুনে ‘উচ্চশিক্ষার ভবিষ্য’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। এসব কনফারেন্সে শতাধিক গবেষণাপত্র এবং প্রতিটি কনফারেন্স শেষে ১৬টি ভলিউম প্রকাশ করা হবে।
