গৃহকর্মীদের সুরক্ষা

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২১, ২১:৪৪

করোনাভাইরাস মহামারি সারা বিশ্বেই সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ওপর প্রভাব ফেলেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গৃহকর্মী বা গৃহশ্রমের সঙ্গে জড়িত মানুষ। জীবিকা নির্বাহ করতে অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ বেছে নেয় এমন গৃহশ্রমিকের সংখ্যা আমাদের দেশে কম নয়। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা বেশি। পুরুষের মধ্যে শিশু বেশি। তারা কাজ হারিয়েছে এবং দরিদ্র থেকে অতি দরিদ্র হয়েছে। গৃহকর্মীদের অধিকাংশই গ্রাম থেকে শহরে আসে নিজেদের পরিবারকে একটু ভালো রাখার আশায় বা একটু স্বচ্ছন্দে থাকতে। শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সিরা গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে। শত কষ্ট সহ্য করেও তারা টিকে থাকতে চায়। তারপরেও প্রায়ই পত্রপত্রিকায় গৃহকর্মী নির্যাতনের ভয়ংকর সব খবর প্রকাশিত হয়ে থাকে। সভ্য শিক্ষিত পরিবারে তাদের নির্যাতন সহ্য করতে হয়। এক্ষেত্রে যৌন হয়রানির ঘটনাও কম নয়। গৃহকর্মীর ওপর অতি তুচ্ছ কারণেও ভয়ংকর নির্যাতন করা হয়। যাঁরা অন্যের বাড়িতে স্থায়ীভাবে কাজ করেন, তাঁরা অন্যের সংসার সামাল দিয়ে খুব কম সময়ই নিজের সংসারে দিতে পারেন। আবার যাঁরা প্রতিদিন নির্দিষ্ট কাজ করেন, তাঁরাও নিজের জন্য সময় পান সামান্যই। এত পরিশ্রমের পরেও তাঁদের শ্রমের জন্য কোনো মূল্য নির্ধারণ করা হয়নি।

কঠোর পরিশ্রম করলেও গৃহকর্মীদের শ্রমের মূল্যায়ন আমরা কোনোদিন করিনি। গৃহশ্রমিকদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করতে হলে তাদের আইনের সুরক্ষায় আনতে হবে। তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। লক্ষ করলে দেখা যাবে, দেশে দরিদ্র, অশিক্ষিত নারীর একটি অংশ যাদের জন্ম গ্রামে অথবা শহরের দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা কোনো পরিবারে, সেসব পরিবার থেকে গৃহকর্মী বেছে নেওয়া হয়। তাদের কাজ পরিবারে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা সেই পরিবারই বুঝতে পারে। অথচ তাদের কাজের কোনো স্বীকৃতি নেই।

গৃহশ্রমিক নির্যাতন বন্ধে ২০১৫ সালে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। সেখানে আছে—কোনো গৃহকর্মীকে চাকরি থেকে অপসারণ করতে হলে এক মাস আগে তা জানাতে হবে। গৃহকর্মীও যদি চাকরি ছাড়তে চায় তবে নিয়োগকারীকে সেটা জানাবে এক মাস আগে। তাত্ক্ষণিকভাবে গৃহকর্মীকে চাকরি থেকে বাদ দিলে এক মাসের মজুরি দেওয়ার বিধান করা রয়েছে। গৃহকর্মী অপরাধ করলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে, তবে নিয়োগকারী নিজে তাকে শারীরিক বা মানসিক শাস্তি দিতে পারবেন না। এছাড়া কোনো গৃহকর্মী যৌন হয়রানি ও নির্যাতন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করলে সরকারি তা পরিচালনা করবে। গৃহকর্মীর কাজের মূল্যায়ন তখনই সম্ভব, যখন পরিবারে তার অবদানের মূল্যায়ন করা হবে। সারা দিন হাড়ভাঙা খাটুনি করলেও তার কাজের স্বীকৃতি নেই। অথচ সে পরিবারের একজন সহায়তাকারী। পরিবারের সুখে-দুঃখে সেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তথাকথিত হাই সোসাইটি, শিক্ষিত পরিবারেই গৃহকর্মীর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হচ্ছে। যার কোনোটা প্রকাশিত হচ্ছে আবার কিছু অন্তরালেই রয়ে যাচ্ছে। এই নিষ্ঠুরতা বন্ধ করতে হবে। গৃহকর্মীদের শ্রমের মর্যাদা দিতে তাদের নিয়োগ, বেতন নির্ধারণ, উত্সবভাতার ব্যবস্থা, চিকিত্সা সুবিধা ইত্যাদির বিধি প্রণয়ন করতে হবে। তাদের শ্রমের স্বীকৃতি দিয়ে এটিকে একটি পেশা হিসেবে গণ্য করতে হবে। গৃহকর্মীদের সামাজিক মর্যাদা বজায় এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।

পাবনা