পর্যটন কেন্দ্রগুলোর দিকে নজর দিন

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:০৫

হিমেল আহমেদ

বাংলাদেশ পর্যটন শিল্পে সম্ভাবনাময় একটি দেশ। সুজলা-সুফলা অপরূপ এই বাংলাদেশে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য রয়েছে আকর্ষণীয় সব প্রাকৃতিক পর্যটন কেন্দ্র। বিশ্বের বৃহত্তম ‘ব’ দ্বীপ হিসেবে পরিচিত এই দেশ শুরু থেকেই আকর্ষণীয়। এই শীতের সময় ছাড়াও সারা বছরই দেশি-বিদেশি পর্যটকগণ ঘুরে বেড়ান পুরো দেশ। কেননা আমাদের রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সমুদ্র কক্সবাজার। আছে সেন্ট মার্টিনের মতো অপরূপ আইসল্যান্ড। কিন্তু বর্তমানে দেশের বিরাট এই পর্যটন কেন্দ্রের সৌন্দর্য বিলীন হতে চলেছে। হয়ত এখানে শতভাগ দায় আমাদেরই। কক্সবাজারের সমুদ্রের পানিতে গোসল করতে গেলে দেখা যায় মুখের ওপর আছড়ে পড়ে প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট! সেন্ট মার্টিনের অবস্থা আরও নাজুক। প্রতিদিন সেন্ট মার্টিন ভ্রমণের জন্য আসেন প্রায় তিন হাজার পর্যটক। আর এখন তো পর্যটন মৌসুম। তাই দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিনে বেড়েছে অতিরিক্ত মানুষের চাপ। এখন তিনটি প্রমোদতরী ও ১০টির বেশি কাঠের ট্রলার নিয়ে প্রতিদিন সেন্ট মার্টিন যাচ্ছেন ৩ হাজারের বেশি পর্যটক। কয়েক মাস আগেই প্রতিদিন সেন্ট মার্টিন যেতেন প্রায় ৭ হাজারের বেশি পর্যটক। কয়েক দিনের মধ্যে পুরোদমে ছয়টি জাহাজ পুনরায় চালু হলে লোকসমাগম আবারো বেড়ে যাবে। ফলে সেন্ট মার্টিনের অবস্থা আরও বিপন্ন হবে বলে জানিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। জানা গেছে, বেশির ভাগ পর্যটক সেন্ট মার্টিনের ১০৬টি হোটেল-কটেজে থাকেন। আর অবাক হওয়ার তথ্য হলো কোনো হোটেলে সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নেই! তাই হোটেল বর্জ্য চলে যাচ্ছে সমুদ্রে। এতে সমুদ্রের স্বচ্ছ নীলজল ঘোলাটে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। জাহাজের ইঞ্জিনের পাখার কারণে সমুদ্রের তলদেশের বালু পানিতে মিশে প্রবালের ওপর জমে আস্তরের সৃষ্টি হচ্ছে। এতে বিশাল প্রবাল এলাকা মরে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। দ্বীপটিতে ১৫৪ প্রজাতির শৈবাল, ১৫৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৬৮ প্রজাতির প্রবাল, ১৯১ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ১০ প্রজাতির কাঁকড়া, ৬ প্রজাতির প্রজাপতি, ২৩৪ প্রজাতির মাছ, ৪ প্রজাতির উভচর ও ২৯ প্রজাতির সরীসৃপ রয়েছে। দ্বীপে ৭৭ প্রজাতির স্থানীয় পাখি, ৩৩ প্রজাতির পরিযায়ী পাখিসহ মোট ১১০ প্রজাতির পাখি ও ২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী ছিল। যার অধিকাংশ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় দেশের বিরাট এই পর্যটন কেন্দ্রকে রক্ষা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। কক্সবাজার ছাড়াও কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত যাকে সাগরকন্যা বলা হয়। এই কুয়াকাটার অবস্থা আরও খারাপ। সড়কপথে ঢাকা থেকে কুয়াকাটা যেতে আগে তিন তিনটি ফেরি পার করা লাগত। বর্তমানে একটি ফেরি পার করতে হচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার আরও উন্নতি হলে পর্যটক আরও বাড়বে। কুয়াকাটার তীর জুড়ে ময়লা-আবর্জনা ভাসতে দেখা যায়। সাগরকন্যা খ্যাত এই সমুদ্রসৈকতকে দূষণমুক্ত রাখার দায়িত্ব কিন্তু আমাদেরই। এছাড়াও কুতুবদিয়া, বাঁশবাড়িয়ার মতো ছোট ছোট বেশ কয়েকটি সমুদ্র বীচ রয়েছে যেগুলো অযত্নে সৌন্দর্য হারাচ্ছে। এই সিবীচগুলোও পর্যটন শিল্পের আওতাভুক্ত করা উচিত। ভ্রমণপিপাসুদের জন্য পাহাড় পর্বত ও প্রাকৃতিক দৃশ্য আকর্ষণ করে বেশি। সে হিসেবে বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, সিলেট, সীতাকুণ্ড কিংবা খুলনার সুন্দরবন পর্যটকদের তীর্থস্থান বলা চলে। নীলগিরি, নীলাচল, চিম্বুক পাহাড়ে প্রতিনিয়ত পর্যটকদের ভিড় বাড়ছে। সেনা সংরক্ষিত এলাকা হওয়ার কারণে বান্দরবানের অবস্থা অনেকটা ভালো। এই শীতে রাঙ্গামাটির কঙ্কাল পাহাড়ে সাজেক ভ্যালি ভ্রমণপিপাসুদের প্রধান আকর্ষণ। মেঘ ও পাহাড়ের মিলনমেলা দেখতে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক আসছেন এখানে। তারপরও দেখা যায় পর্যটকগণ বিভিন্ন উচ্ছিষ্ট আবর্জনা যত্রতত্র ফেলে পরিবেশ নোংরা করেন। এদিকে সচেতন হতে হবে আমাদের সবার। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের অবস্থা খুব যে ভালো তা কিন্তু নয়। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। সুন্দরবন রক্ষায় সরকারকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এছাড়া সারা দেশে পর্যটন শিল্পের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার করার দায়িত্ব আমাদের সবার। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, পর্যটন পয়েন্টগুলোর প্রতি বিশেষ যত্ন, অবহেলিত পর্যটন শিল্পের প্রতি দৃষ্টিদানসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বাংলাদেশকে পর্যটন খাতকে আরও দৃঢ় করবে বলে আমরা মনে করি।

n লেখক :শিক্ষার্থী, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া