চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন :দুই প্রার্থীর ইশতেহার

উন্নত নগরী গড়ার প্রতিশ্রুতি রেজাউলের বাসযোগ্য নগরীর প্রতিশ্রুতি শাহাদাতের

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২১, ২২:৫৭

চট্টগ্রাম মহানগরীবাসীর জন্য উন্নয়নের ৩৭ দফা লক্ষ্য ও প্রতিশ্রুতি উপস্থাপন করে আসন্ন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা এম রেজাউল করিম চৌধুরী নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। গতকাল শনিবার সকালে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের বঙ্গবন্ধু হলে তিনি এ ইশতেহার ঘোষণা করেন। ইশতেহার ঘোষণার শুরুতেই তিনি বলেন, চট্টগ্রামকে সর্বাধুনিক বাসোপযোগী বিশ্বমানের উন্নত ও নান্দনিক নগর হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।

মেয়রপ্রার্থী মো. রেজাউল করিম চৌধুরী ঘোষিত ইশতেহারে ৩৭ দফা উন্নয়ন লক্ষ্য ও প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে—জলাবদ্ধতা নিরসন, ১০০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচি, সড়কে শৃঙ্খলা আনয়ন ও যানজট নিরসন, খাল-নদী ও নালা-নর্দমা থেকে দখলদার উচ্ছেদ, নগরীতে উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রণয়ন, চট্টগ্রামকে পর্যটন রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলতে জোরদার প্রচেষ্টা, যৌক্তিক ও সহনীয় মাত্রায় হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ ইত্যাদি।

এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার চট্টগ্রামে চলমান প্রকল্প, মেগা প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়নে বন্দরসহ সব সেবা খাতের উন্নয়নকাজে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে জোরদার ভূমিকা ও সমন্বয়কের ভূমিকা পালনের প্রত্যয় ঘোষণা করেন রেজাউল করিম।

নির্বাচনি ইশতেহারে শীর্ষ স্লোগান রাখা হয়, ‘রূপসী চট্টগ্রাম আমার আপনার অহংকার, অঙ্গীকার-সবার যোগে সাজবে নগর’। ইশতেহারে রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম প্রকৃতির এক অনন্য উপহার। চট্টগ্রামে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম প্রাকৃতিক সমুদ্র বন্দর। দক্ষিণ এশিয়ার প্রবেশদ্বার এই বন্দর। জাতীয় আমদানি-রপ্তানির ৮৫ শতাংশ চট্টগ্রাম দিয়ে পরিচালিত হয়। স্বাভাবিক কারণে চট্টগ্রাম দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা। 

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত ১২ বছরে চট্টগ্রাম বন্দর বিশ্বমানের আন্তর্জাতিক বন্দরে পরিণত হয়েছে। তাই চট্টগ্রাম অনেক দূর এগিয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের ভূমিবেষ্টিত সেভেন সিস্টার, চীনের কুনমিংসহ, নেপাল ও ভুটানের আমদানি-রপ্তানির ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার হবে চট্টগ্রাম। পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম পর্যটন তীর্থ হিসেবে গড়ে উঠবে বৃহত্তর চট্টগ্রাম।

মেয়রপ্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী তার অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রতিশ্রুতি ছাড়াও আরো যেসব প্রতিশ্রুতি নির্বাচনি ইশতেহারে তুলে ধরেন সেগুলোর মধ্যে রয়েছে, নদীগুলো সংস্কার করে নৌ-রুট চালু করে নগর পরিবহনের বাড়তি চাপ কমানো, মশকমুক্ত নগরী গড়তে কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব উপযোগী কীটনাশক প্রয়োগ, বদ্ধ ডোবা, জলাশয় নিয়মিত পরিষ্কার রাখা, নারী-পুরুষ সবার জন্য নিরাপদ পাবলিক টয়লেট স্থাপন, ফুটপাত দখল নিরুত্সাহিতকরণ, সর্বত্র সড়ক বাতি ও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, স্বল্প খরচে শিক্ষার মানসম্মত বিকাশ, করপোরেশনের স্বাস্থ্যসেবা খাতকে সমুন্নত রাখা এবং এসব খাতে নগরীর ধনাঢ্য ও করপোরেট গ্রুপকে যুক্ত করা, রাজস্বসহ সব সেবা খাতের পূর্ণাঙ্গ নিজস্ব ডাটাবেজ তৈরি করে সেগুলোকে ওয়ানস্টপ ডিজিটাল সার্ভারের আওতায় আনা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে খেলার মাঠ রাখার ওপর জোর দেওয়া, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সৃজনশীল কাজে উত্সাহ এবং বই পড়ায় উদ্বুদ্ধ করা, নগরীতে পাহাড় কাটা এবং জলাশয় ভরাট বন্ধ করা, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নসমূহ সংরক্ষণ করা, কিশোর অপরাধের আখড়া নির্মূল করা ইত্যাদি।

বিএনপি প্রার্থীর ৯

দফা প্রতিশ্রুতি

চসিক নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম নগরীর উন্নয়নে ৯ দফা প্রতিশ্রুতি সম্বলিত ইশতেহার ঘোষণা করেছেন বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন। তার প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে—সবার জন্য বাসযোগ্য ও জলাবদ্ধতা মুক্ত চট্টগ্রাম, স্বাস্থ্যকর চট্টগ্রাম, শিক্ষাবান্ধব চট্টগ্রাম, গৃহ কর ও আবাসন সুবিধা, পরিচ্ছন্ন চট্টগ্রাম, নিরাপদ চট্টগ্রাম, সাম্য-সম্প্রীতির চট্টগ্রাম, নান্দনিক পর্যটন নগর এবং তথ্য প্রযুক্তি সমৃদ্ধ চট্টগ্রাম বিনির্মাণ করা। গতকাল শনিবার নগরীর জামালখানে একটি রেস্টুরেন্টে তিনি ইশতেহার ঘোষণা করেন।

ইশতেহার ঘোষণার সময় ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম মহানগর একটি পাহাড়, সাগর ও নদী পরিবেষ্টিত শহর। পাহাড় হতে বৃষ্টির পানি বিভিন্ন খাল হয়ে শহরের মধ্য দিয়ে কর্ণফুলী নদীতে পতিত হয়। অবৈধভাবে পাহাড় কাটার কারণে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি মাটি পড়ে খাল ও নালা বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এছাড়াও বর্জ্য অব্যবস্থাপনার কারণে তা খালে গিয়ে পড়ে। যা নিরসনে বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করব।

তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা মুক্ত চট্টগ্রাম গড়তে শহরের মধ্যে প্রবাহিত খাল উদ্ধার করে তা পানি চলাচলের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং খালের উভয় পাশ রক্ষায় বাঁধ নির্মাণ করা হবে। প্রতি বছর বর্ষার আগে শহরের সমস্ত খাল, নালা-নর্দমা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংস্কারসহ পানি চলাচলের উপযুক্ত করে শহরের জলাবদ্ধতা নিরসন করব। ডা. শাহাদাত বলেন, নগরবাসীর নাগরিক অধিকার আমাদের সংবিধান নির্দিষ্ট করেছে—কিন্তু সে অধিকার দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। সংবিধানের মৌলিক অধিকারসমূহ নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র তার বিভিন্ন অঙ্গ ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ কাজ করে থাকে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ নাগরিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যদি অন্য প্রতিষ্ঠানসমূহ বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনই পারে বিদ্যমান উন্নয়ন অংশীদার প্রতিষ্ঠানসমূহের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করে নগরবাসীর দোরগোড়ায় উন্নয়ন পৌঁছে দিতে। নির্বাচিত হলে আমি আপনাদের সঙ্গে নিয়ে এ প্রচেষ্টায় সফল হবো ইনশাআল্লাহ।

সাম্য সম্প্রীতির চট্টগ্রাম গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডা. শাহাদাত বলেন, চট্টগ্রামের হাজার বছরের ঐতিহ্যের আলোকে সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মীয় সহনশীলতা ও সম্প্রীতির মেলবন্ধনে আবদ্ধ করার প্রয়াস থাকবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে মাদকাসক্তির ঝুঁকি কমাতে সার্বিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা, গির্জা, কবরস্থান, শ্মশান ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আর্থিক এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হবে।

নান্দনিক পর্যটন নগর গড়তে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, নগরীকে অল্প সময়ে বিশ্বের অন্যতম নগরীতে পরিণত করার জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে পাহাড়, নদী, সমুদ্র, বিরল প্রকৃতির সৌন্দর্য্যের আলোকে পর্যটন শিল্পের বিকাশ সাধন করে আধুনিক আকর্ষণীয় পর্যটন নগর গড়ে তোলা হবে। নগরবাসীর সুবিধা নিশ্চিত করে পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বিদেশি পর্যটন আকর্ষণের নিমিত্তে দেশি-বিদেশি সহযোগিতায় বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ, বিনোদন কেন্দ  ইত্যাদি নির্মাণ করা হবে। শিক্ষাবান্ধব চট্টগ্রাম গড়া হবে বলে জানান তিনি। এছাড়া নিম্ন আয়ের নগরবাসী, মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ পরিবারের আবাসন গৃহ করমুক্তসহ নানা প্রতিশ্রুতি দেন।