‘নির্মাতার স্বাধীনতার নামে আপনি কাউকে কটাক্ষ করতে পারেন না’ —জাকির হোসেন রাজু

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২১, ১৯:৫৫

জাকির হোসেন রাজু। এদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে নিজেস্ব ব্র্র্যান্ডনেম যুগের সর্বশেষ প্রতিনিধি। যার নামে ছবির দর্শক গুনেছে প্রযোজক। যার ছবির প্রধান ইএসপি তারকা নয়, ছবির গল্প ও নির্মাণশৈলী। তিন তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত এই বরেণ্য চিত্রনির্মাতা কথা বলেছেন বিনোদন প্রতিদিনের সঙ্গে—

তানভীর তারেক

প্রথমেই অভিনন্দন তৃতীয়বারের মতো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জনের জন্য। কেমন আছেন? বর্তমানে কী নিয়ে ব্যস্ত?

ধন্যবাদ, কেমন আছি এটা বলা মুশকিল। তবে এই করোনাকালে আমার একটি পরিকল্পনা ব্যাহত হয়েছে। দীর্ঘদিন এই শিল্পে কাজ করে একবার মনে হয়েছিল নিজের প্রযোজনায় একটি ছবি করবো। কারণ অন্যের ঘরের ছবি করতে হলে কোনো না কোনোভাবে তার ভাবনার দায় নিতে হয়। তাই ভেবেছিলাম স্বাধীনভাবে একটি ছবি করবো। একজন লগ্নিকারক কথাও দিয়েছিলেন। বলেছিলেন তার লাভ দরকার নেই, শুধু লগ্নি ফেরত এলেই হবে। আমি কথা দিয়েছিলাম কিছু লোকশান হলেও সেই ভর্তুকি না হয় আমিই দিয়ে দেবো। তবে করোনার এই ভয়াবহ সময় থমকে দিলো। তবে গল্প রেডি হয়ে আছে। দেখা যাক।

চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে আপনি যেমন নিজেস্ব একটি ব্র্রান্ডভ্যালু তৈরি করতে পেরেছেন। বেশ ক’জন তারকাও দিয়েছেন ইন্ডাস্ট্রিকে। এরপরের প্রজন্ম কেন সেই অর্থে ব্র্র্যান্ড হয়ে উঠলো না?

একেবারেই ওঠেনি তা নয়। তবে অবক্ষয়টা একদিনে তৈরি হয়নি। আমাদের সময় বা তারও আগে যারা ছবি প্রযোজনা করতেন তাদের ভেতরে শিল্পবোধ ছিল। কারণ প্রথমেই বলে নিই, অন্য যেকোনো ব্যবসার সঙ্গে সিনেমা ব্যবসা মেলালে হবে না। আপনার শিল্প রুচিবোধের সঙ্গে দেশপ্রেম, এসব ব্যাপারে নূন্যতম কমিটমেন্ট থাকতে হবে। কিন্তু এখনকার প্রযোজকরা অনৈতিক পয়সায় শুধু ফূর্তি করার জন্য ছবি করছে। ফলে কিছু নির্মাতা নামের টেকনিশিয়ান সেই প্রযোজকদের ফূর্তির জোগানদার হচ্ছে। ফলাফল আজকের ইন্ডাস্ট্রি।

খান আতা, জহির রায়হান, সুভাষ দত্তের সমকালীন কিংবা তারপরে শহীদুল ইসলাম খোকন ভাইদের আমলে প্রত্যেক নির্মাতার নিজেস্ব কিছু তৈরি আর্টিস্ট থাকতো। যাদের নিয়ে রেগুলার ছবি করতেন। ফলে একাধিক স্টার সুপারস্টার ছিল তখন। কিন্তু এরপর তো আর কেউই কোনো ঘরানার তারকা তৈরি করতে পারলেন না। ঘুরে ফিরে ঐ একজন সুপারস্টার নির্ভরতা চলে এলো। এর দায় কী নেবেন না?

অবশ্যই নেবো। কিন্তু এই দায় আমি বলবো সিনিয়রদের থেকে এসেছে। এই তারকা নির্ভরতা ইন্ডাস্ট্রিকে পিছিয়ে দিয়েছে। সিনিয়র নির্মাতা যারা ছিলেন তারা অনেকেই নিজের হাতেগড়া তারকাদের নিয়ে বারবার কাজ করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে ওদের ভেবে গল্প লিখেছেন। ফলে তারা মনে করেছেন তারাই ইন্ডাস্ট্রি। তাই দায় শুধু এ প্রজন্মকে দিলে হবে না।

এখন তো অনেক সিনিয়র তারকা অভিযোগ করেন যে, সিনেমায় এক-দু’জনের বেশি চরিত্রে কোনো সিনিয়রদের কাস্ট করা হয় না...

এর জবাবও আগের প্রশ্নেই বলেছি। ঐ যে আপনি তো তারকার ওপর গল্প তৈরি করেছেন। ফলে তাদের ভেতরে এক ধরনের অহম চলে এসেছে। তারা ভেবেই বসেছেন আমিই ইন্ডাস্ট্রি। ফলে পরে যখন তাকে ছোটখাটো গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অফার করা হয়েছে তিনি পুরনো স্মৃতিদম্ভে ভেবেছেন আমি ইন্ডাস্ট্রিকে চালিয়েছি, এখন কেন ছোটখাটো চরিত্রে কাজ করবো! একদিনে কোনোকিছুই গড়ে না, আবার কোনো ভাঙনও তৈরি হয় না।

ব্যক্তিগত দায় থেকে কী বলবেন?

আমার ছবিগুলো নিয়ে গবেষণা করতে বলবো। বাজি লেগে বলতে পারবো তারকা মাথায় রেখে গল্প আমি লিখিনি। একবার মাত্র দুটি সিকোয়েন্সের জন্য খলিল ভাইকে রাজি করিয়েছিলাম। কারণ চরিত্রটি ছিল ববিতার বাবা। এখন পর্দায় ববিতা যদি যাকে তাকে বাবা ডাকে দর্শক হতাশ হবে। আমি খলিল ভাইকে এই বিষয়টিই বুঝালাম। তিনি রাজি হলেন। এখানেও গল্পের প্রয়োজনে এনেছি।

সাম্প্রতিক ইস্যুতে অনন্য মামুনের একটি ছবি নিয়ে নির্মাতার কাজের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে কেউ কেউ। আপনার মতামত শুনতে চাই—

দেখুন, একটা কবিতা বলি। স্বাধীনতার প্রতীক যে পতাকা সেটিও কিন্তু সুতো দিয়ে বাঁধা থাকে। স্বাধীনতা মানে লাগামহীনতা নয়। স্বাধীনতা হলো নিয়মের ভেতরে থেকে সমৃদ্ধ করা নিজেকে। আপনি কোনো সম্প্রদায়কে, কোনো সিস্টেমের অপব্যাখ্যা দিয়ে কটাক্ষ করতে পারবেন না। সবকিছুরই ভালো-মন্দ আছে। সেটা তুলে ধরতে পারেন। আইন নিয়েও আপনি বলতে পারেন যে, এটার পরিবর্তন প্রয়োজন। তবে সেটা একপেশে তুলে ধরতে পারেন না। আমি কী আমার ছবিতে সমাজ সচেতনতা দেখাইনি? সিস্টেমের ভুল দেখাইনি? কিন্তু কোনো সম্প্রদায়কে তো আঘাত করিনি। নির্মাতার স্বাধীনতার নামে আপনি কাউকে কটাক্ষ করতে পারেন না।

শেষ প্রশ্ন। অনেকে আক্ষেপ করে বলেন, সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি এখন সিনেমার মানুষদের হাতে নেই!

দেখুন, এ নিয়ে আমার গুরু দারাশিকো ভাইয়ের একটা ছোট্ট কথা বলে শেষ করি। একদিন এফডিসিতে আমার কাঁধে হাত রেখে উনি অনেক সময় ধরে হাঁটছিলেন আর গল্প করছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি বললেন, ‘রাজু আমার জীবনে যা কিছু সাফল্য তার জন্য যেমন আমি দায়ী, আমার যে ব্যর্থতা, এই অভাব এ সবকিছুর জন্যও আমি দায়ী।’ আমি তার এই কথাটি খুব মনে রাখি। কোনোকিছুর জন্য অন্যকে দায় চাপিয়ে লাভ নেই!