অতিমারি, মহামারি ও দৈবদুর্বিপাকের মতো বিশেষ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা ছাড়াই মাধ্যমিক (এসএসসি), উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসএসি) ও সমমানের ফল প্রকাশ এবং পাশের সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি বাধা কাটল। এসংক্রান্ত তিনটি আইনে সংশোধনী আনতে পৃথক তিনটি বিল গতকাল রবিবার সংসদে পাশ হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ২০২০ সালের এইচএসসি ও সমমানের ফল ঘোষণা এবং পাশের সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে আর আইনি কোনো বাধা থাকবে না। এখন রাষ্ট্রপতি বিলগুলোতে সম্মতি দিলেই সেগুলো আইনে পরিণত হবে, এরপর ফল প্রকাশ করা হবে। দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৮৯ জন শিক্ষার্থীর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল গত বছরের ১ এপ্রিল থেকে। কিন্তু করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফল পেতে এই শিক্ষার্থীদের অপেক্ষার অবসান ঘটছে দুই-তিন দিনের মধ্যেই। ফল প্রকাশিত হওয়ার পর এই শিক্ষার্থীদের স্নাতক পর্যায়ের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির প্রক্রিয়া শুরু হবে।
শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি ১৯ জানুয়ারি সংসদে ‘ইন্টারমিডিয়েট অ্যান্ড সেকেন্ডারি এডুকেশন (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২১’, ‘বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড (সংশোধন) বিল, ২০২১’ ও ‘বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (সংশোধন) বিল, ২০২১’ উত্থাপন করেন। পরে বিলগুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। স্থায়ী কমিটি পাশের সুপারিশ করে বিল তিনটির ওপর ২১ জানুয়ারি সংসদে প্রতিবেদন উপস্থাপন করে। শিক্ষামন্ত্রী গতকাল সংসদে পৃথকভাবে বিল তিনটি পাশের প্রস্তাব করলে সেগুলো কণ্ঠভোটে পাশ হয়। সংসদে উত্থাপনের চার দিন পরই পাশ হলো বিল তিনটি।
দুই দিনের মধ্যে গেজেট, এরপর এইচএসসির ফল :শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেছেন, ‘ইন্টারমিডিয়েট অ্যান্ড সেকেন্ডারি এডুকেশন (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২১ পাশ হয়ে গেলে গেজেট প্রকাশের জন্য দুই দিনের মতো সময় লাগবে। তার পরই আমরা ফলাফল প্রকাশ করতে পারব। কাজেই এটি নিয়ে বিলম্বের কোনো সুযোগ নেই।’ মহামারির মধ্যে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার যুক্তি তুলে ধরে দীপু মনি বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে আমরা শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সংক্রমণের আশঙ্কা থেকে দূরে রাখতে পেরেছি।’ অন্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও কওমি মাদ্রাসা আগে খোলার বিষয়ে তিনি বলেন, কওমি মাদ্রাসার অধিকাংশ শিক্ষার্থী এতিম ও দুস্থ। তাদের বেশির ভাগই আবাসিক। সেখানে তারা থাকার সুযোগ না পেলে তাদের জীবন দুঃসহ অবস্থায় পড়বে। তাই সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে অনেকগুলো শর্তসাপেক্ষে এটা খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
শুধু দশম ও দ্বাদশের নিয়মিত ক্লাস, বাকিদের সপ্তাহে এক দিন
শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেন, ৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর দশম ও দ্বাদশ শ্রেণির নিয়মিত ক্লাস হবে। অন্য শ্রেণির শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে এক দিন করে আসবে। পুরো সপ্তাহের পড়া নিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক, শ্রেণিকক্ষে তাদের গাদাগাদি করে বসতে হয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে বসানো সম্ভব হয় না। তাই সব শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে না এনে আলাদা-আলাদা দিনে ক্লাসে আনার ব্যবস্থা হবে। আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের প্রস্তুতি নিতে বলেছি। এরপর জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির পরামর্শ নিয়ে ঘোষণা করব কবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলব।’
অটো পাশের সমালোচনা
বিল তিনটি পাশের আগে বিলের ওপর দেওয়া জনমত যাচাইবাছাই কমিটিতে পাঠানো এবং সংশোধনী প্রস্তাবগুলোর নিষ্পত্তি করেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। বিল তিনটি পাশের প্রক্রিয়ায় সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা) ও বিএনপির কয়েক জন সংসদ সদস্য। বিএনপির হারুনুর রশীদ বলেন, করোনাকালে বহু শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। পরীক্ষা থাকলে শিক্ষার্থীরা টেবিলে বসে। একটা পরীক্ষা নেওয়া যেত। অটো পাশ দিয়ে দেওয়ায় একটি ভয়াবহ সংকট তৈরি হলো। মেধাবীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলো। এ বিষয়ে আরো চিন্তা-ভাবনা করার প্রয়োজন ছিল।
গণফোরামের মোকব্বির খান বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পাবলিক পরীক্ষাগুলো নেওয়া যেত। এখানে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। জাপার মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, এর আগে এ ধরনের অটো পাশ দেওয়া হয়েছিল। ঐ বছর যারা পাশ করেছিলেন, তারা একটা গ্লানি বয়ে বেড়িয়েছেন। একটা বদনাম ছিল। এ বছর সংক্ষিপ্ত আকারে একটা পরীক্ষা নেওয়া যেত। জাপার ফখরুল ইমাম বিলটিকে সমর্থন করে বলেন, তবে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হলেও কওমি মাদ্রাসাগুলো খোলা কেন?
বিএনপির এমপি ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, শিক্ষার্থীরা মূলত পড়াশোনা করে পরীক্ষা সামনে রেখে। আগের পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে এইচএসসির ফল প্রকাশ করা হলে ইনসাফ নিশ্চিত হবে না। মেধাবীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশে সবকিছুই চলছে। স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই। তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হলো না কেন?
শিক্ষামন্ত্রীর জবাব
ঐ সংসদ সদস্যদের বক্তব্যের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেন, বেশির ভাগ দেশে বাংলাদেশের মতো কাছাকাছি পদ্ধতিতে ফল প্রকাশ করা হয়েছে। একেবারে চিন্তা-ভাবনা ছাড়া এভাবে ফল প্রকাশ করা হচ্ছে তা নয়। প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষাবিদ, কোভিড-১৯ জাতীয় পরামর্শক কমিটি—সবার সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, জেএসসি ও এসএসসির ফলাফলের ভিত্তিতে এইচএসসির ফল দেওয়া হবে। যারা মেধাবী, তারা এ দুটো পরীক্ষায় মেধার স্বাক্ষর রেখেই এসেছেন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে জবাবে দীপু মনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা হবে। পরীক্ষা অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে হবে। এটি হলে শিক্ষার্থীদের হয়রানি কমবে। অভিভাবকদের খরচ ও হয়রানি কম হবে।
সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের মাধ্যমে চলতি ২০২১ শিক্ষাবর্ষের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনা জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে এবং সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ফেব্রুয়ারিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা সম্ভব হবে। যদি আমরা খুলে দিতে পারি, তাহলে সেই সিলেবাসের ওপরে এসএসসির ক্ষেত্রে তিন মাস ও এইচএসসির ক্ষেত্রে চার মাস যদি অন্তত ক্লাস করাতে পারি, তাহলে সেই সিলেবাসের ওপরে পরীক্ষা নিতে পারব। কাজেই যারা পরীক্ষা না নিলে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে বলছেন, আশা করি তারাও আশাবাদী হবেন।’ সংক্রমণের ‘রিয়েল টাইম’ বিচার-বিশ্লেষণ করে সরকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কোন জায়গায় শিক্ষাজীবন ব্যাহত হচ্ছে, কোন জায়গায় ঘাটতি হচ্ছে, আগামী শিক্ষাবর্ষে কী করে তা পূরণ করব—সমস্ত কিছুই বিবেচনায় নিয়ে আমাদের কাজ করতে হচ্ছে।’
৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে যেতে চায় এমন জরিপ প্রতিবেদন প্রসঙ্গে দীপু মনি বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন এসএমএস, ইমেইলসহ নানা ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে তথ্য পাচ্ছি, সেক্ষেত্রে আমরা এর উলটোটা দেখতে পাচ্ছি। এটি নিয়ে নানা রকমের মত আছে। অবশ্যই আমরা শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা প্রশাসনের সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদের সবাইকে নিয়ে চিন্তাভাবনা করেই অগ্রসর হচ্ছি।’
