দেশে চুরি-ডাকাতি, খুনখারাবি, মাদক ইত্যাদি থামিয়া নাই। গ্রামগঞ্জেও মাদকের আগ্রাসন এখন ছড়াইয়া পড়িয়াছে। ইহাতে পুলিশের দায়িত্ব-কর্তব্য যে কোনো সময়ের তুলনায় বাড়িয়াছে; কিন্তু আমরা আজও সেইভাবে পুলিশকে শক্তিশালী বাহিনী হিসাবে গড়িয়া তুলিতে পারি নাই। পুলিশের সাজসরঞ্জাম, বিশেষত যানবাহনের ঘাটতি আজও রহিয়াছে। যদিও গত এক দশকে পুলিশের সুযোগ-সুবিধা পূর্বের তুলনায় বাড়িয়াছে; কিন্তু ইহা এখনো পর্যাপ্ত নহে। দেশের ১৬-১৭ কোটি মানুষের নিরাপত্তা বিধানে বর্তমানে পুলিশ বিভাগে যে ২ লক্ষাধিক সদস্য রহিয়াছেন তাহা অপ্রতুল। বাংলাদেশে ১ লক্ষ মানুষের বিপরীতে রহিয়াছেন মাত্র ১২০ জন পুলিশ। উন্নত রাষ্ট্রের কথা বাদই দিলাম, আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল, মিয়ানমার, পাকিস্তান ও মালয়েশিয়ায় এই সংখ্যা হইল যথাক্রমে ১৫০, ১৯৩, ১৭০, ১৮১ ও ৩২০। এই জনবল ঘাটতিতে আমাদের দেশে একজন পুলিশ সদস্যকে আজও নির্ধারিত সময়ের চাইতে দেড় হইতে দ্বিগুণ সময় বেশি ডিউটি করিতে হয়। তাহাদের আবাসনসংকট এখনো প্রকট। তাহারা জরাজীর্ণ গাড়ি ব্যবহার করে, বিশেষত মফস্সল এলাকায়। তাহাদের উন্নত আগ্নেয়াস্ত্র ও প্রশিক্ষণেরও অভাব রহিয়াছে।
পুলিশের উপর্যুক্ত দৈন্যদশার পরও বিগত কয়েক বত্সরের মধ্যে বড় ধরনের আইনশৃঙ্খলার অবনতির ঘটনা তেমন একটা নাই বলিলেই চলে; কিন্তু বিশেষ করিয়া স্থানীয় নির্বাচনের সময় যে সহিংসতার ঘটনা ঘটে, তাহাতে পুলিশের ব্যর্থতাকে অনেক সময় আড়াল করিবার সুযোগ নাই। আজ চট্টগ্রামে সিটি করপোরেশন নির্বাচন হইতেছে। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া ইতিমধ্যে দুই জনের প্রাণহানি ঘটিয়াছে। এখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি লইয়া অনেকেই শঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন। নির্বাচনের সময় কে কোন দল বা মতাদর্শের, তাহা পুলিশের বিবেচনা করিবার কথা নহে। তাহাদের কর্তব্য জনগণের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; কিন্তু সম্প্রতি কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা পৌর নির্বাচনে ভোটগ্রহণকালে দায়িত্বরত একজন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের সহিত একজন এসপির যে অশোভন আচরণের ঘটনা ঘটিয়াছে তাহা অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। ইহা অবশ্য একটি ব্যতিক্রম ও বিচ্ছিন্ন ঘটনা। পুলিশ বিভাগে অনেক দক্ষ, সত্ ও যোগ্য ব্যক্তি রহিয়াছেন যাহারা দেশমাতৃকার কল্যাণে নিরলস কাজ করিয়া যাইতেছেন। মনে রাখিতে হইবে সরকারের অন্যান্য যেসব প্রতিষ্ঠান রহিয়াছে, সেই সকল প্রতিষ্ঠানের লোকেরাও ধোয়া তুলসী পাতা নহে।
অন্যদিকে যে কোনো নির্বাচনে শুধু পুলিশই নহে, তাহাদের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করিয়া থাকেন। থাকেন র্যাব ও বিজিবি সদস্যরাও। তাই দায়িত্ব অবহেলার জন্য শুধু পুলিশ সদস্যদেরই দোষারোপ করিবার অবকাশ নাই। তবে পুলিশকে বলা হয় জনগণের বন্ধু। তাহাদেরকে বলা হয়, ‘দ্য নিয়ারেস্ট পারসনস টু দ্য পিপল’। বিপদে-আপদে সর্বাগ্রে জনগণের পার্শ্বে পুলিশেরই আসিয়া দাঁড়াইবার কথা; কিন্তু ইহার বিপরীতে যখন পুুলিশ জনগণের রক্ষক না হইয়া ভক্ষকের ভূমিকা পালন করে, জনগণ পুলিশ কর্তৃক নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়, তখন সেই রাষ্ট্র পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হয়। অথচ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়া মোটেও কাম্য নহে।
আমরা পুলিশি রাষ্ট্র চাই না, আবার পুলিশবিহীন রাষ্ট্রও কল্পনাতীত। অতএব, জনগণ যাহাতে মনে না করেন যে, বাংলাদেশে একটি পুলিশি রাষ্ট্র কায়েম হইয়াছে, এই জন্য পুলিশ সদস্যদের অধিকতর সতর্ক হইয়া দায়িত্ব পালন করিতে হইবে। সিনিয়র পুলিশদের হইতে হইবে আরো দায়িত্বশীল। হাইকোর্টে তলব করিবার পর সেই এসপি যে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করিয়াছেন, তাহা একটি শুভ লক্ষণ। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন’—এই মূলমন্ত্রে পুলিশ সদস্যদের থাকিতে হইবে অটল ও অবিচল।
