দৃষ্টিভঙ্গি পালটাতে হবে

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২১, ২১:৪২

পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষেরই জন্ম দিয়েছেন কোনো না কোনো নারী। অথচ সেই নারীর প্রতি নির্যাতন ক্রমশ বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা বা নির্যাতনের ব্যাপকতা ও ধরন ভয়াবহ। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পদে পদে নারীকে অনবরত অ্যাসিড সন্ত্রাস, উত্ত্যক্ত, যৌন হয়রানি, পারিবারিক সন্ত্রাস, বঞ্চনা অবহেলা, অবমাননা অত্যাচার, হত্যা, যৌতুকের শিকার, ধর্ষণ, ফতোয়া, পাচার ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হতে হয়। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ করতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পালটাতে হবে।

দেশে চাকরিতে পিছিয়ে থাকলেও শিক্ষায় এগিয়ে রয়েছে নারী। সরকারি হিসাবে, বাংলাদেশের প্রাথমিক পর্যায়ে বর্তমানে ভর্তির হার শতকরা ৯১ শতাংশ। মেয়েশিশুর ক্ষেত্রে ৯৪ দশমিক ৭ শতাংশই ভর্তি হয়। আর ছেলেশিশুর ভর্তির হার ৮৭ দশমিক ৮ শতাংশ। গত কয়েক বছরের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক ফলাফলেও দেখা গেছে, সব কয়টি শিক্ষা বোর্ডেই ছেলেদের তুলনায় মেয়ে শিক্ষার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন অথবা সমান ফলাফল করেছেন। তবে শিক্ষায় এগিয়ে থাকলেও চাকরির ক্ষেত্রে মেয়েরা পিছিয়ে পড়েছেন। বর্তমানে সরকারি চাকরিতে কর্মরত আছেন মাত্র ২৪ শতাংশ নারী। তবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চাকরিতে এ হার ৬০ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরিতে প্রবেশের সময় নারীর অংশগ্রহণ কমে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুসারে তিন বছরে দেশের শ্রমবাজারে নারী শ্রমিকের প্রবেশগমতা কমেছে ২ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০১১ সালে শ্রমবাজারে নারী শ্রমিক ছিল ৩৩ শতাংশ যা ২০১৩ সালে এসে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০০০ সাল থেকে ১০ বছরে যে হারে নারী শ্রমিক শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছেন তা ধরে রাখার অনুকূল পরিবেশ না থাকায় শ্রমিক সংখ্যা হ্রাস পায়। ২০১৪ সালে সিপিডির করা নারীর অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজের ওপর এক গবেষণায় দেখা যায়, অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজের মূল্যমান জিডিপির ৭৭ শতাংশ। নারী শ্রমিকরা পার্ট-টাইম কাজ করেন গড়ে আট ঘণ্টার কম। বিবিএসের জরিপ অনুসারে দেশে বর্তমানে কৃষি খাতে ৯০ লাখ ১১ হাজার নারী নিয়োজিত। যার বিরাট অংশ  মজুরিবিহীন শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। রপ্তানি খাতের সিংহভাগ রেমিট্যান্স আসে নারী শ্রমিকের মাধ্যমে। কিন্তু এই অবদানের অধিকাংশ জাতীয় জিডিপিতে প্রতিফলিত হয় না। ২০১০ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ৯১ লাখ গৃহস্থালির কাজে নিয়োজিত। অ্যাকশান এইড ও ব্র্যাকের এক গবেষণায় দেখা যায়, নারীর জীবনের প্রায় ১২ বছর কেটে যায় রান্না করে। কিন্তু নারীর এই নিরন্তর অবদান প্রায়ই হয়ে যায় মূলধারার অগোচরে।

স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকে নারীরা অনেকটা পথ এগিয়েছেন। শিক্ষা, রাজনীতি, চিকিত্সা, কর্মক্ষেত্র এবং উত্পাদনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীরা রেখেছেন অগ্রণী ভূমিকা। প্রমাণ করেছেন নারী আর পুরুষের পেশা বলে আলাদা কিছু নেই। এমনকি নারীরা পিছিয়ে নেই পুলিশ বাহিনীতেও। এখানেও তারা সফলতার স্বাক্ষর রাখছেন। নারী পুলিশ এখন অস্ত্র হাতে অভিযান পরিচালনা, সেবামূলক কাজ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় রাজপথে কাজ করছেন। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে নারীর ভূমিকা এখন শীর্ষে। সাফল্য, সাহসিকতা আর মনোবলকে সম্বল করে নারীরা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত।

বাংলাদেশ  মহিলা পরিষদ এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদন অনুযায়ী গত পাঁচ বছরে দেশে নারী নির্যাতনের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমলেও মাত্রা বা ভয়াবহতার দিক থেকে বেড়েছে। অবশ্য নারী নির্যাতনের সব ঘটনা থানাপুলিশ পর্যন্ত গড়ায় না। লোকলজ্জার ভয়ে অন্তরালে থেকে যায়। নির্যাতিতদের মাত্র ২ শতাংশ আইনের আশ্রয় নেন। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী দেশের ৩০-৫০ শতাংশ নারী কোনো না কোনোভাবে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার। আর মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে শতকরা দশমিক ৭০ এবং শহরাঞ্চলে শতকরা ৩৯ দশমিক ৭০ শতাংশ নারী স্বামীর ঘরে নির্যাতনের শিকার। অ্যাকশান এইড বাংলাদেশ পরিচালিত এক গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীদের ৮৮ শতাংশই বলেন, তারা পথচারী, পুরুষযাত্রী এবং ক্রেতাদের দ্বারা হয়রানির শিকার হন। এই গবেষণা অনুসারে, শহরে চলাচলকারী ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ নারী পরিবহন, রাস্তা কিংবা উন্মুক্ত জনবহুল এলাকায় চলাফেরার ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত এক জরিপের তথ্যানুসারে, বাংলাদেশের ৮৭ শতাংশ বিবাহিত নারীই আপনগৃহে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। এর মধ্যে ৬৫ শতাংশ শারীরিক নির্যাতন, ৬ শতাংশ যৌন নির্যাতন, ৮২ শতাংশ মানসিক ও ৫৩ শতাংশ অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার। জাতিসংঘের তথ্য মতে, বিশ্বের ৩৫ শতাংশ নারী তার জীবদ্দশায় মানসিক বা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

বাংলাদেশে ১৫ বছরের বেশি বয়সি ১০ কোটি ৯১ লাখ মানুষের মধ্যে নারীর সংখ্যা ৫ কোটি। মোট কর্মক্ষম জনশক্তির অর্ধেকের বেশি নারী হলেও কর্মবাজারে আছে মাত্র ২ কোটি। এ হিসাবে নারী জনগোষ্ঠীর মাত্র ৩৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ সরাসরি কর্মবাজারে আছেন। হাজার বছরের পথচলায় আজও বহমান নারীর অধিকার আন্দোলন। আগে নারীর ক্ষমতায়ন ছিল বিলাসী স্লোগান কিন্তু  এখন আনন্দময় বাস্তবতা। সার্বিক বিচারে নারীর ক্ষমতায়নের অভূতপূর্ব সাফল্য দেখা গেলেও নারীর প্রতি বৈষম্য দূর হয়নি এখনো। নারীর অগ্রযাত্রায় এখনো প্রধান বাধা সহিংসতা। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ করতে হলে অবশ্যই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পালটাতে হবে।

n লেখক :সাবেক পুলিশ ও র্যাব কর্মকর্তা