বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ছয় শতাধিক জাতের পাখি সচরাচর দেখা যায়। যদিও বর্তমানে তা থেকে কমপক্ষে ৩০ প্রজাতি বিলুপ্ত। বাকিদের মধ্যে ১৪৩টি প্রজাতির পাখি বাংলাদেশে খুবই কম চোখে পড়ে। বাকি ৪৭৭ প্রজাতির পাখি নিয়মিত দেখা যায়। পাখিদের এই মিছিলে তিন শতাধিক রয়েছে যাদেরকে আবাসিক বা দেশীয় এবং বাকিদের অনাবাসিক অর্থাত্ পরিযায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরিযায়ী পাখিকেই আমরা সাধারণত অতিথি পাখি হিসেবে জানি। পরিযায়ী পাখিরা সারা বছর জুড়ে থাকে না এই ভূ-খণ্ডে। শীত মৌসুমে নভেম্ব্বর থেকে আসতে থাকা পরিযায়ী পাখিদের মধ্যে হাঁস জাতীয় পাখিগুলো উল্লেখযোগ্য। এদের মধ্যে রয়েছে লেজহাঁস, পেরিহাঁস, চমাহাঁস, জলপিপি, রাজসরালি, বালিহাঁস ইত্যাদি। এছাড়া পানকৌড়ি, বক, শামুককনা, গাঙ কবুতর, বনহুর, হরিয়াল, চখাচখিম সারস, কাইমা, শ্রাইক, নারুন্দি, মানিকজোড়সহ নাম না জানা আরো বহু প্রজাতির পাখির সমাবেশ ঘটে দেশের হাওর অঞ্চলগুলোতে। অন্যান্য সময়েও পরিযায়ী পাখিরা আসে, তবে তা হাতেগোনা কয়েকটি প্রজাতি।
আর পরিযায়ী পাখিরাই সব থেকে বেশি আকর্ষণীয় পাখিপ্রেমি এবং সঙ্গে সঙ্গে পাখির শত্রু ‘পাখি শিকারিদের’ কাছে। দেশীয় বন্যপাখিগুলো সাধারণত পরিযায়ীদের মতো জাঁক বেঁধে চলে না এবং নির্দিষ্ট সময়ও মানে না, তাই শীত মৌসুম মানে শিকারিদের উত্সবের মৌসুম। শীত উপলক্ষ্যে পরিযায়ী পাখির সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় প্রজাতির পাখিগুলোও ধরা পড়ে, তাছাড়া সারা বছরই দেশীয় পাখি শিকার অব্যাহতভাবে চলতে থাকে।
পাখির কাজ যে কেবল প্রকৃতির শোভাবর্ধন করা নয়, বরং পরিবেশ ও জীবন রক্ষা করা এবং তার প্রমাণ বিভিন্ন জাতীয় আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলো। মার্টিন নিফেলারের নেতৃত্বে সুইজারল্যান্ডের বাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক বিভিন্ন সময়ে করা ১০৩টি গবেষণা পর্যালোচনা করে জানিয়েছে, প্রতি বছর সারাবিশ্বের পাখিরা ৪০ থেকে ৫০ কোটি মেট্রিকটন ক্ষতিকর পোকামাকড় খায়। এই পোকামাকড় থেকে সঞ্চিত শক্তির পরিমাণ নিউ ইয়র্ক শহরের আকারের সমান হবে। ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে পাখিরা পরিবেশ ও কৃষিতে যে ভারসাম্য রক্ষা করে তা অবিশ্বাস্য। পরিযায়ী পাখির মধ্যে এক ধরনের হাঁস জাতীয় পাখি আছে, যারা কেবল আগাছার বীজ খেয়ে থাকে। পাখির বিষ্ঠা মাটিতে জমা হয়ে মাটিকে ফসফরাস ও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ করে।
পাখির এত বিশাল প্রয়োজনীয়তা জানা থাকার পর পাখি শিকার থেকে বিরত থাকা নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। পাখি বিষয়ে অজ্ঞতাও অনেক সময় যেহেতু শিকারের কারণ হয় সেহেতু শিকার রোধে প্রধানতম কাজ হবে জনসচেতনতা সৃষ্টি। যার জন্য সব থেকে কার্যকর মাধ্যম বলা যায় সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি যদি অল্প সময়ে শিক্ষকরা পাখি শিকার রোধের প্রয়োজনীয়তা ছাত্রদের বোঝাতে পারেন, তবে অনেকাংশে তা সফল হবে। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে জনসাধারণের কাছে সঠিক বার্তা সরবরাহ করেও সচেতনতা তৈরি করা যেতে পারে। সচেতনতা সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগও করতে হবে। এ বিষয়ে সচেতন মহলের এগিয়ে আসা খুবই জরুরি, এলাকাবাসী যদি কোনো এলাকায় সংগঠিত হয়ে পাখি শিকারকে না বলে যেমনটা কিছু কিছু অঞ্চলে দেখা যায়, তবে পাখি শিকার বন্ধ করা তেমন কষ্টসাধ্য ব্যাপার নয়। খুব ভোরে পাখির কলকাকলিতে ঘুম ভাঙুক প্রকৃতির নিস্তব্ধতার!
n লেখক :শিক্ষার্থী, ডিপার্টমেন্ট অব মার্কেটিং, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
