‘বই আমাদেরকে অতিমানবীয় শক্তি জোগায়’ গ্যালিলিওর এই উক্তির পাঁচশ বছর পর কার্ল সাগান অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে বলেন :
‘বই কী আশ্চর্য একটি জিনিস! গাছ থেকে তৈরি একটি সমতল বস্তু, যার ওপর কালো কালো আঁকাবাঁকা জটিল রেখার ছাপ দেওয়া হয়। একবার চোখ বুলিয়েই আপনি আরেকজন মানুষের মনের ভেতরে ঢুকে পড়েন, যিনি হয়তো হাজার বছর আগেই মারা গেছেন। হাজার বছর আগের সেই লেখক নীরবে এবং স্পষ্টভাবে সরাসরি আপনার মনের সাথে কথা বলছেন। লেখা সম্ভবত মানব সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি আবিষ্কার, যা বিভিন্ন মানুষকে একত্রিত করে, যারা কখনো কেউ কাউকে দেখেনি, অনেক দূরের যুগের নাগরিক। বই সময়ের শৃঙ্খল ভেঙে দেয়।’
‘বই একটি প্রমাণ যে, মানুষ জাদুর মতো কাজ করতে সক্ষম আর এর অনুঘটক হচ্ছে পাঠকের কল্পনা।’ তবে ঠিক কীভাবে আমরা পড়তে শিখেছি, যা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচিতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ? স্টিভেন রজার ফিশার তাঁর রচিত ‘অ্যা হিস্ট্রি অব রিডিং’ বইয়ে দেখিয়েছেন, কীভাবে সংকেতের উষালগ্ন থেকে শুরু করে আমরা ইলেকট্রনিক টেক্সট পর্যন্ত এসেছি এবং বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন পড়া বলতে আসলে কী বোঝায়।
ভূমিকায় তিনি একটি কাব্যিক কাঠামো তুলে ধরেছেন :
আত্মার জন্য সংগীত যা, মনের জন্য বই পড়াও তা-ই। পাঠ চ্যালেঞ্জ করে, শক্তি দেয়, সম্মোহিত এবং সমৃদ্ধ করে। ছোট ছোট কালো দাগ আমরা সাদা কাগজে বা কম্পিউটার স্ক্রিনে দেখি, এগুলো আমাদেরকে অভিভূত করে চোখে জল এনে দেয়, জীবনে নতুন অন্তর্দৃষ্টি এবং বোধশক্তি এনে দেয়, অনুপ্রাণিত করে, আমাদের অস্তিত্ব সুবিন্যস্ত করে সকল সৃষ্টির সাথে আমাদেরকে সংযুক্ত করে।
এর চেয়ে বড়ো বিস্ময় আর কী হতে পারে।
লেখা ও পড়া হাত ধরাধরি করে চললেও, পড়া আসলে লেখার সরাসরি বিপরীত—আসলে মস্তিষ্কের আলাদা আলাদা অংশ সক্রিয় করে। লেখা একটি দক্ষতা, পড়া একটি কর্মশক্তি। লেখা শুরুতে শ্রমবলে উত্পাদন করা ছিল, তারপর ধীরে ধীরে অন্যভাবে ব্যবহার করার উপযোগী কৌশল তৈরি হয়; অন্যদিকে পড়ার বিকাশ হয়েছে লিখিত শব্দের সুপ্ত শক্তির গভীর উপলব্ধিবোধ থেকে। লেখার ইতিহাস হচ্ছে অন্যের মত গ্রহণ এবং পরিমার্জন আর পড়ার ইতিহাসের সাথে সমাজের পর্যায়ক্রমে পূর্ণতা প্রাপ্তির বিষয়টি জড়িত। লেখা হচ্ছে প্রকাশ, পড়া হচ্ছে মনোগত প্রতিক্রিয়া। লেখা সর্বজনীন, পড়া ব্যক্তিগত। লেখা হচ্ছে সীমিত, পড়া হচ্ছে মুক্তমনা।
লেখা একটি মুহূর্তকে নিশ্চল করে দেয়, পড়া চিরকালের।
পড়া সবসময় লেখা থেকে ভিন্নরকম ছিল। লেখা শব্দকে অগ্রাধিকার দেয়, কেননা উচ্চারিত শব্দকে প্রতিনিধিত্বমূলক সংকেতে রূপান্তরিত করতে হয়। তবে পড়া অর্থকে অগ্রাধিকার দেয়। আসলে পড়ার কর্মশক্তির সাথে লেখার দক্ষতার তেমন একটা সম্পর্ক নেই।
পড়া তাহলে কী? এর উত্তর তেমন সরল নয়, কেননা পড়ার কাজটি পরিবর্তনশীল, অবিমিশ্র নয়। পড়ার সর্বাধুনিক সংজ্ঞায় পড়াকে ছাপা বা লিখিত প্রতীকের অর্থ বোঝার সক্ষমতা বলা হয়েছে। ‘প্রতীকসমূহ ব্যবহার করে একজন পাঠক স্মৃতি থেকে তথ্য উদ্ধার করে এবং পরবর্তীতে এই তথ্য ব্যবহার করে লেখকের বার্তাটির একটি যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা তৈরি করে।’
তবে পড়া সবসময় এরকম ছিল না। শুরুতে এটা ছিল একটি সংকেত থেকে তথ্য আহরণ করে এর অর্থ বোঝার সরল ক্ষমতা। পরবর্তী সময়ে একটি তলের ওপর অনন্যভাবে অবিরাম খোদাই করা চিহ্নের অর্থ বোঝানো হয়েছে। সাম্প্রতিককালে ইলেকট্রনিক স্ক্রিনের সাংকেতিক তথ্য আহরণ করাও এতে অর্ন্তভুক্ত হয়েছে। ভবিষ্যতে পড়ার সংজ্ঞা নিঃসন্দেহে আরো বিস্তৃত হতে থাকবে। তাছাড়া এটি মানবজাতির অগ্রগতিরও একটি আদর্শ মানদণ্ড।
পড়া মানে স্রেফ অক্ষরের সাথে শব্দ যুক্ত করা নয়, যা কেবল প্রাথমিক পর্যায়ে হয়। এতে অর্থও জড়িত থাকে একটি মৌলিক উপায়ে। চোখে দেখে পড়ার উচ্চতর স্তরে এমনকি কোনো শব্দের সহায়তা ছাড়াই অর্থ উপলব্ধি করা হয়।
আর সেখানেই রয়েছে পড়ার জাদুর মতো তাত্পর্য।
তথ্য বিনিময়ের পাঁচটি পর্যায়—উত্পাদন, প্রেরণ, গ্রহণ, সঞ্চয় এবং পুনরাবৃত্তি। তবে পড়া শরীরের এক অংশকে উদ্দীপিত করে অন্য অংশে চেতনা সৃষ্টি করে। এখানে দেখা এবং শোনার উভয় ইন্দ্রিয়ই একসাথে কাজ করে।
প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় সংকেত শব্দে পরিণত হয়েছিল। তারপর এই ধারণাটি পশ্চিমে নীলনদ, পুবে ইরানের মালভূমি হয়ে সিন্ধু পর্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে বিভিন্ন ভাষা ও সামাজিক প্রয়োজনে অন্য চিত্রলেখ-সংক্রান্ত শব্দের চাহিদা তৈরি হয়। সবজায়গাতেই তথ্য আহরণ এবং সঞ্চিত রাখার কাজে লেখাই অত্যন্ত অমূল্য হাতিয়ার হিসেবে স্বীকৃত হয় :হিসাব, মালামাল গুদামজাত এবং পরিবহনের কাজ সহজতর হয়। এছাড়া মানুষের স্মৃতিশক্তির চেয়েও আরো ভালোভাবে নাম, তারিখ এবং বিভিন্ন স্থানের স্মৃতি ধরে রাখা যায়। প্রাথমিক সকল ‘পড়াই’ ছিল অত্যন্ত সরল সংকেত চেনার সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং তা অবশ্যই কর্মসংক্রান্ত ছিল।
সুমেরীয় ভাষায় ‘পড়া’ শব্দটিকে বলা হতো সিতা, এর অর্থ ছিল ‘হিসাব, গণনা, বিবেচনা, মনে রাখা, জোরে জোরে পড়া।’ তবে মোসোপটেমিয়ার খুব কম মানুষেরই পড়ার ক্ষমতা ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দে উর নগরীর আনুমানিক ১২,০০০ জনসংখ্যার মধ্যে বড়োজোর একশো জন লিখতে-পড়তে পারত।
খ্রিস্টপূর্ব ১৮৫০ থেকে ১৫৫০ পর্যন্ত ব্যবিলনের নগর-রাষ্ট্র সিপারের আনুমানিক ১০,০০০ অধিবাসীর মধ্যে মাত্র ১৮৫ জন অনুলেখকের নাম পাওয়া যায়।
মেসোপটেমিয়ার লেখকদের এই ব্যর্থতা থেকে অনুমিত হয় যে, পড়া ছিল মুখ্যত একটি কাজ। অর্থাত্ এটা কোনো নিঃসঙ্গ, প্রীতিকর, নীরব কর্ম ছিল না—বরং এটা ছিল সর্বজনীন, চাপিয়ে দেওয়া উচ্চরব। লিখিত শব্দ কেবল ইতিপূর্বে মুখস্থ করা কোনো মূলপাঠ পুনরুদ্ধারের কাজটি স্মরণ করিয়ে দিত। কেননা সকল মেসোপটেমীয় সাহিত্য, এমনকি লিখিত সাহিত্যও ছিল সর্বজনীন এবং মৌখিক। লেখা তখনো ছিল সর্বজনীন অনুষ্ঠান শেষ করার একটি উপায়। এই নিয়ম হাজার হাজার বছর ধরে চলছে এবং এখনো শেষ হয়নি : একাকী লিখিত শব্দের মুখোমুখি হওয়া।
লিপিফলক তাদের হয়েই ‘কথা’ বলত, যাদের সিলমোহর রয়েছে এগুলোর ওপর। ব্যবিলনের বিচারকগণ একটি লিপিফলকের বিষয়কে এর ‘মুখ’ বলতেন, জনসমক্ষে দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করতেন যে, লিপিফলকটি তারা ‘অন্তর’ থেকে করেছেন। কেউ তা চ্যালেঞ্জ করতে পারত না। কারো সিলমোহর অস্বীকার করলে কঠোর শাস্তি দেওয়া হতো। লিখিত কথাই ছিল প্রকৃত কণ্ঠস্বর।
