ঘাড়ের এক বিঘত নিচে, অস্বস্তিকর একটা ব্যথা নিয়ে ঘুম ভাঙল। পেটের ওপর আড়াআড়ি পর্দার মতো ঝুলে আছে সূর্য। পর্দা বেয়ে চোখ ওপরে তুলতেই মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে। যেই ফাঁক গলে সূর্য ঢুকেছে, কিছু মেঘ সেখানে শ্যাওলা হয়ে জমেছে, পুরোনো দিনের স্যাঁতসেঁতে স্মৃতির মতো।
পাশ ফিরে শুলে ঠান্ডা একটা গন্ধ নাকে আসে, সেই সাথে গালে লাগে মসৃণ শীতল স্পর্শ। একে একে সব ইন্দ্রিয় জেগে উঠছে। ঠান্ডা পাথুরে মেঝেতে শুয়ে অপেক্ষা করে বাকি ইন্দ্রিয়গুলো জেগে ওঠার।
না, চোখ বন্ধ করে অনেক হাতড়েও কোনো শব্দ খুঁজে পাওয়া যায় না। ছবি-গন্ধ-স্পর্শগুলো যেন মাথার কানাগলিতে ছুটোছুটি করে মরছে—এক টুকরো শব্দ পেলেই নিজেদের ভেতর কথা বলতে শুরু করবে।
অসাড় হয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। চোখে কালো পর্দা টেনে অপেক্ষা করতে থাকে। শীতলতা ভুলে সে অপেক্ষা করতে থাকে। সে অপেক্ষা করতে থাকে; অপেক্ষা করতে থাকে।
তার মনে হয়, সময় অনন্ত।
বস্তুত সময় অনন্তই নয় কি!
একসময় নিজের অস্তিত্বই অসহ্য ঠেকতে থাকে। তবু সে পড়ে থাকে। পড়ে থাকে খড়ের গাঁদার মতো জমে থাকা একরাশ আলস্যের নিচে। নিজেকে মনে হতে থাকে অন্যকেউ। যুদ্ধ চলে। যুদ্ধ।
একসময় সে অথবা অন্য কেউ জিতে যায়। উঠে বসে; মাথাটা ফাঁপা মনে হয়! উঠে দাঁড়ায়; আড়মোড়া ভেঙে যেন গা থেকে ঝেড়ে ফেলতে চায় হলুদ খড়।
টলমল পায়ে চলা শুরু হয়। তার মনে পড়ে যায় প্রথম পদক্ষেপের কথা, অথবা তার মনে পড়ে না। অনেক প্রথমের মতো, প্রথম হাঁটতে পারার সফলতা কারো মনে থাকে না। থাকলে হয়তো শুধু এই আত্মতৃপ্তিতেই মানব সভ্যতা থমকে যেত।
মসৃণ পাথরে হাত রেখে মোড় ঘুরতেই আলোর মুখ দেখে। আলো। তার সত্তায় জেগে ওঠে তার কোনো এক পূর্বপুরুষ। কোটি বছর আগের। যে চাঁদের আলোয় পাখা মেলেছিল।
সে হাঁটতে থাকে। হাঁটতে থাকে মুগ্ধের মতো। অন্ধকারের লক্ষ্মণরেখা পার হওয়ার সময় কি সে এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়ায়! না।
শরতের দিন। নীল আকাশ। সাদা মেঘ। সবুজ ঘাস। শিশির বিন্দু। একখণ্ড ধূসর পাথর।
পাথরটা দেখে মনে হয়, চাদর গায়ে কেউ একজন জবুথবু বসে আছে। এই ঝকঝকে রোদের ভেতরেও যেন তার চারপাশে রাত জমেছে। মনে পড়ে যায়, অন্ধগলির ভেতরে ওষুধের দোকানের বৃদ্ধটার কথা। যে ঘুমের ওষুধ চাইলে, কোন কোম্পানির জিজ্ঞেস করেও বিব্রত করত না। এমনকি সে যেদিন দুটোর বদলে দু-পাতা চাইল, সেদিনও যে বিস্মিত হয়নি।
সে ঘাস মাড়িয়ে এগিয়ে যায় বনের দিকে। গাদাগাদি হয়ে থাকা বন। ঢুকে পড়তেই ফার্মগেটের ওভার ব্রিজের নিচের কথা মনে পড়ে যায়। শুধু মনে হতে থাকে বের হতে হবে। এখান থেকে বের হতে হবে কোথাও।
সরু সরু গাছের ধাক্কায় এগিয়ে চলে। এগিয়ে চলে অন্ধের মতো। হঠাত্ নাকে আসে ভেজা একটা গন্ধ। একটা নদী। একটা নদী। পাথুরে একটা নদী।
একটা সরু-অগভীর পাথুরে নদী।
সে বসে পড়ে একটা পাথরের ওপর। কোনো এক ঢলের দিনে এই নদীরই বয়ে আনা ছোট একটা পাথরের ওপর। সে বসে থাকে। সে বসে থাকে। তার কোনো তাড়া নেই। তার কারো কাছে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। তার কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই। সে বসে থাকে।
সে বসেই থাকে। তাকে সঙ্গ দেয় আর সব কিছু। এমনকি সময়েরও যেন আজ তাড়া নেই। খুব ধীরে বয়ে যায়। শুধু নদীটাই বয়ে চলে নিজের মতো।
তার পেছনের অন্ধকারটুকু চাঁদের মতো কমতে কমতে পক্ষ পরিবর্তন করে আবার বাড়তে শুরু করে। আলোর রং তরল হতে থাকে ক্রমে ক্রমে। সে উঠে দাঁড়ায়। নিজের ভেতর সে যেন বাড়ি ফেরা পাখির তাড়া অনুভব করে।
সে হাঁটতে থাকে। নদীর কূল ধরে। সন্ধ্যা বাড়তে থাকে। সন্ধ্যার সাথে বাড়তে থাকে তার অস্থিরতা। হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়। অস্থিরতা বাড়তে থাকে। সে আরো দ্রুত হাঁটে। অস্থিরতা বাড়তে থাকে।
আলো-আঁধারির সবচেয়ে রহস্যময় সময়ে সে নদীটির কিনারা খুঁজে পায়। নদীটি পাহাড়ের নিচ থেকে ওপরে উঠে আসছে। সে পাহাড়ের ধারে গিয়ে দাঁড়ায়। দু-একটা জলের ফোঁটা তখন আলোর ফুল হয়ে, আবার সাথে সাথেই ঝরে পড়ছে।
সে নিচের জমাট অন্ধকারের দিকে তাকায়। অনেক নিচে দু-একটা আলোর বিন্দু।
সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হয়, তাকে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু কোথায়?
সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সে কি ফিরে যাবে তার অনুভূতিহীন নিরাপদ আশ্রয়ে, নাকি কি ঝাঁপ দেবে। ঝাঁপ দেবে নিচের অন্ধকারে।
আমি দাঁড়িয়ে থাকি, আমার সাহস হয় না, অন্ধকার আমাকে টানে, আমি দাঁড়িয়ে থাকি, আমার ভয় হয়।
আমি কি ফিরে যাব? সে কি ফিরে যাবে? সব—অপমান, হতাশা, অতৃপ্তি—সে কি ফিরে যাবে? লোভ, ঈর্ষা, পরশ্রীকাতরতা—সে কি ফিরে যাবে?
সে ফিরে যাবে—সব লজ্জা, ভয়, সংশয়? অবসাদ, একাকীত্ব, বিরক্তি? বিষণ্নতা!
সে কি ফিরে যাবে?
দুঃচিন্তা, উদ্বেগ, ভালোবাসা!
কিন্তু সেই শীতের সকাল, কুয়াশা, শিশির, খেজুর রস। বর্ষার দুপুর, সরু নদী, কাদা, খলসে-পুঁটি-কই। বিকেল, উঁচু-নিচু মাঠ, ছোটাছুটি, ফুটবল। বন্ধু।
ঝাঁ ঝাঁ রোদ—স্কুল যাওয়া, স্কুল পালানো। রাস্তায় ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়ানো। সিঙারা-পুরি-এক কাপ চা। জ্যোত্স্না রাত। উথাল-পাথাল স্বপ্ন, স্বপ্নভঙ্গ। বেদনা। প্রেমে পড়া। ভালোবাসা।
সে জানে, নিষ্ঠাবান যন্ত্রীর মতো অন্য কারো বেঁধে দেওয়া একই রাগ তাকে বাজিয়ে যেতে হবে বারবার। বারবার। তবে তার মনে হতে থাকে, সুরটা সে বাজাবে কিনা অন্তত সে সিদ্ধান্তটা নিজের। পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে সে সিদ্ধান্ত নিতে থাকে।
২.
কিনু গোয়ালার গলি। তবে ঢাকায়। জানালায় কোনো পর্দা নেই, দরকারও নেই। জানালা কখনো খোলা হয় না। জানালা খুললেই ড্রেনের বিকট গন্ধ। তাই সকাল, দুপুর অথবা দুপুর রাতে মেঝেতে পেতে রাখা তোষকের ওপর বুলবুলের ঘুম ভাঙলে, তার মনে হয় সময় জট পাকিয়ে আছে। কয়টা বাজে দেখার জন্য এক চোখ খুলেই, হাতড়ে ফোনটা হাতে নেয়। অজান্তেই সে কখন হারিয়ে যায় ফেসবুকের আকাশি নীল দুনিয়ায়। কয়টা বাজে, অনেকক্ষণ তার আর জানা হয় না।
অলঙ্করণ :অভিজিত্ চৌধুরী
