আমার ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে খুবই আশ্চর্যবোধ হয়, যে মুখভরে অট্টহাসি দেয় অথচ সে জানে না পরকালে সে জান্নাত পাবে নাকি জাহান্নামের আগুন তার মুখের লাগাম হবে। উক্তিটি করেছেন সময়ের শ্রেষ্ঠ আলেম, উম্মতের রুহানি ডাক্তার মাওলানা আবুল লাইস সমরকান্দী (র) তার বিখ্যাত গ্রন্থ তাম্ব্বিহুল গাফেলিনে। আসলে বর্তমানে আমাদের ঈমানের এমন দুরবস্থা হয়েছে যে, আমরা পরকালীন জীবন সম্পর্কে একেবারেই গাফেল হয়ে আল্লাহর কঠিন শাস্তির কথা ভুলে দুনিয়ার খেল-তামাশায় লিপ্ত হয়ে পড়েছি। আমরা এমনভাবে জীবনযাপন করছি যেন পরকালীন জীবনকে আমরা একেবারে ভুলেই গিয়েছি। হাসি-ঠাট্টা আর দুনিয়ার খেল-তামাশা বাদ দিয়ে আখেরাতের চিন্তা ফিকির করতে রসুল (স) খুব আক্ষেপের সঙ্গে উম্মতকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘(ওহে আমার উম্মতগণ!) আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে, তাহলে খুব কমই হাসতে আর বেশি পরিমাণে কাঁদতে।’ (বুখারি :৪৬২১)
অন্যদিকে আখেরাতের চিন্তা-ফিকির করতে কোরআনুল কারিমে কম কম হাসতে এবং বেশি বেশি পরিমাণে কান্নাকাটি করতে আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা কম কম পরিমাণে হাসাহাসি করো আর বেশি বেশি পরিমাণে কান্নাকাটি করো।’ (সুরা তওবা: ৮২) দুনিয়াতে আখেরাতের চিন্তা-ফিকির করে যে যত বেশি কান্নাকাটি করবে, পরকালীন জীবনে সে তত বেশি হাসতে থাকবে। পক্ষান্তরে দুনিয়াতে যে যত বেশি হাসাহাসি আর খেল-তামাশায় লিপ্ত থাকবে, সে তত বেশি পরকালীন জীবনে কান্নাকাটি করবে। যারা দুনিয়াতে পরকালীন শাস্তির ভয়ে চোখের পানি ফেলে কান্নাকাটি করে, তাদের পরকালীন স্থায়ী মুক্তির ব্যাপারে রসুল (স) ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ‘সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তার সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় দান করবেন, যেদিন তার ছায়া ব্যতীত অন্য কোনো ছায়াই থাকবে না। সেই সাত শ্রেণির মানুষদের মধ্যেই এক শ্রেণির মানুষ স্থান পাবে, যারা দুনিয়াতে নির্জনে একাকী আল্লাহর ভয়ে দুই চোখ থেকে পানি ফেলে কান্না করেছে।’ ( বুখারি :১৪২৩)
যে যত বেশি আখেরাতের চিন্তা-ফিকির করে কান্নাকাটি করে, তার অন্তরটাও তত বেশি নরম হয়ে যায়। পক্ষান্তরে যে যত বেশি হাসাহাসি আর খেল-তামাশায় লিপ্ত থাকে, তার অন্তরটা তেমন কঠিন পাথরের থেকেও শক্ত হয়ে যায়। এ ব্যাপারে রসুল (স.) বলেছেন, ‘তোমরা অধিক পরিমাণে হাসাহাসি কর না। কেননা অধিক পরিমাণে হাসি অন্তরের মৃত্যু ঘটায়।’ (ইবনে মাজাহ :৪১৯৩)। আর অধিক কান্নাকাটি করার কারণে অন্তরটা যেমন মোমের মতো নরম হয়ে যায়। তেমনি অন্তরের বিনয় নম্রতাও আরো বেড়ে যায়। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ তায়ালা কোরআনুল কারিমে বলেছেন, ‘আর তারা কাঁদতে কাঁদতে নতমস্তকে লুটিয়ে পড়ে এবং এটা তাদের বিনয়, নম্রতাকে বৃদ্ধি করে দেয়।’ (বনি ইসরাইল :১১১)
সুরা বাকারার ২৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘জাহান্নামের ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।’ এ কথা জানার পর জড় পদার্থ পাথর আল্লাহর আজাবের ভয়ে ক্রন্দন করতে করতে পাহাড়-পর্বতে ঝরনাধারা পর্যন্ত প্রবাহিত করে ফেলেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলেও সত্য, মানুষ জাহান্নামের আজাবের ভয়ে ক্রন্দন করা তো দূরের কথা, মানুষের মুখের অট্টহাসি আর খেল-তামাশার দিকে তাকালে মনে হয়, মানুষ যেন আল্লাহর ক্ষমতার ব্যাপারে একেবারেই নির্ভয় তথা বেপরোয়া হয়ে গিয়েছে। মুমিন আল্লাহর আজাবের ব্যাপারে কখনো নির্ভয়ে থাকতে পারে না বরং মুমিন তো সর্বদাই এ ব্যাপারে চিন্তিত ও পেরেশান হয়ে থাকে। এ ব্যাপারে রসুল (স) এর উপদেশ হচ্ছে, ‘(হে আমার উম্মতেরা) তোমরা কান্নাকাটি করো, যদি কান্না না আসে, তাহলে তোমরা কান্নার ভান করে (আল্লাহর কাছে রোনাজারি করো)।’ (ইবনে মাজাহ :৪১৯৬)
জাহান্নামের আজাবের ভয়ে ক্রন্দন করতে করতে মানুষকে পাথরের মতো ঝরনাধারা প্রবাহিত করতে হবে না। কেননা মহান আল্লাহর কাছে মানুষের চোখের একফোঁটা স্বচ্ছ পানির মূল্য এতই যে, শুধু সামান্য একফোঁটা মাছির মাথা পরিমাণ পানি চোখ থেকে বের করলেই তার জন্য জাহান্নামের আগুন আল্লাহ তায়ালা তার জন্য হারাম করে দেয়। এজন্য বলা হয়, একফোঁটা বৃষ্টির পানি দ্বারা বন্যা হতে পারে, যদি বাসাটা হয় পিঁপড়ার। আবার একফোঁটা চোখের পানি দ্বারা জাহান্নামের আগুন নিভে যেতে পারে, যদি চোখের পানিটুকু হয় আল্লাহর জন্য। এ সম্পর্কে রসুল (স) স্পষ্টভাবে হাদিসে বলেছেন, ‘যে মুমিন বান্দার দুই চোখ থেকে আল্লাহর ভয়ে পানি বের হয়, যদিও তা মাছির মাথার পরিমাণ হয় এবং তা কপাল বেয়ে পড়ে, তাতে আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম হারাম করে দেন।’ (ইবনে মাজাহ :৪১৯৭)
অপর এক হাদিসে আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করার ফজিলত সম্পর্কে রসুল (স) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না, যে পর্যন্ত নির্গত দুধ স্তনে ফিরে না আসে (অর্থাত্ এটি অসম্ভব)।’ (তিরমিযি :১৬৩৩)
উপরোক্ত হাদিস থেকে বোঝা যায়, দুধ দোহনের পর পুনরায় সেই দুধ স্তনে প্রবেশ করানো যেমন অসম্ভব, আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দনকারী ব্যক্তিও ঠিক সেরকমভাবে জাহান্নামে প্রবেশ করাও অসম্ভব। অর্থাত্ সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না বরং সে চিরস্থায়ী জান্নাতে প্রবেশ করবে। মহান আল্লাহর কাছে দুটি ফোঁটার চেয়ে প্রিয় জিনিস আর কিছুই নেই। তার একটি হলো, আল্লাহর ভয়ে নির্গত মানুষের চোখের অশ্রুবিন্দু আর অপরটি হলো, আল্লাহর রাহে জিহাদে প্রবাহিত রক্তবিন্দু।’ (তিরমিযী :১৬৬৯)
lলেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
