রেকর্ড পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ, রেকর্ড পরিমাণ প্রবাস আয়, শেয়ারবাজারের উল্লম্ফন, রিয়েল এস্টেটের গরম বাজার ও ব্যাংকের অতিরিক্ত তারল্য (একসেস লিক্যুইডিটি) ইত্যাদি কী ইঙ্গিত দিচ্ছে? এসব কি অর্থনীতি, ব্যবসায়-বাণিজ্যের পুনর্জাগরণের ইঙ্গিত, না সাবধানতা গ্রহণের ইঙ্গিত? এসব প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। তবে একটা ইঙ্গিত আমরা পাই, বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন-২০১৯-২০ পাঠ করলে। মোটা দাগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলতে চাইছে অর্থনীতি, বিশ্ব অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগবে। এর চার কারণ। বৈদেশিক বাণিজ্যে স্থবিরতা বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যে অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধ। এসব কারণের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার কোনো কারণ আমি দেখি না। আমাদের অর্থনীতি এখন বিশ্বের অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ও সংযুক্ত। বিশ্বের ভালো হলে আমাদেরও ভালো, বিশ্বের মন্দা হলে আমাদেরও মন্দা। শত হোক, আমাদের অর্থনীতি অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর দাঁড়িয়ে নেই। তৈরি পোশাক রপ্তানি এবং প্রবাস আয় বা রেমিট্যান্স দুটোই রপ্তানি বাজারের ওপর নির্ভরশীল। আবার আমদানি বাণিজ্যিও মোটামুটি দুটো দেশ তথা চীন ও ভারতের ওপর নির্ভরশীল। রপ্তানি বাজার হচ্ছে ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য (মানবসম্পদ রপ্তানির জন্য)। অতএব বলার অপেক্ষা রাখে না, বিশ্ব মন্দা বা পুনর্জাগরণের সঙ্গে আমরা জড়িত। তবে অভ্যন্তরীণ কতগুলো বিষয়ও আছে, যা একান্তই আমাদের।
শেয়ারবাজার আমাদের একটি মোটামুটি বড় বাজার। নিয়ম হচ্ছে, অর্থনীতি ভালো চললে এর সূচক বাড়ে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে উলটো। করোনা-১৯ মহামারির কারণে অর্থনীতি এখনো ঘুরে দাঁড়াতে সময় নিচ্ছে। অথচ শেয়ারবাজারে কয়েক বছর পর সূচক আবার রেকর্ড করার পর্যায়ে। দৈনিক লেনদেন প্রচুর বেড়েছে। মরা বাজারে ঢেউ উঠেছে। এদিকে ‘রিয়েল এস্টেট বাজারের’ খবরও মন্দ নয়। কাগজে দেখলাম, এই বাজার চাঙ্গা হচ্ছে। এই মন্দার মধ্যেও ফ্ল্যাট বেচাকেনা, জমিজমা বেচাকেনা, বাড়িঘর বেচাকেনা কমেনি। এই দুই বাজারের পর আরেকটি বাজারের অবস্থা আরো অনুধাবনযোগ্য। আর সেই বাজারটি হচ্ছে টাকাপয়সা বা অর্থের বাজার। ব্যাংকের বাজার, আমানত ও ঋণের বাজার।
এই মন্দার বাজারেও ব্যাংকগুলো নগদ অর্থে ফুলে-ফেঁপে উঠছে। তাদের তারল্য দিন দিন বাড়ছে। তারল্য সংকট হলে ব্যাংকের জন্য বিপদ। তা এখন নেই। ‘লিক্যুইডিটি’ দুই রকমের—স্টেটুটরি লিক্যুইডিটি এবং ক্যাশ রিজার্ভ রিকোয়ারমেন্ট। এই দুইয়ের ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ব্যাংকের নিম্নতম সীমা নির্ধারণ করা আছে। এর কম হলে লিক্যুইডিটি সংকট, যা খারাপ অবস্থার ইঙ্গিত করে। আবার বেশি হলে তাকে বলে অতিরিক্ত তারল্য। দুটো দুই ধরনের খারাপ ইঙ্গিত। এই মুহূর্তে ব্যাংকিং খাত অতিরিক্ত তারল্যে ভুগছে। ২০২০ সালের শেষে ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এক বছর আগে এর পরিমাণ ছিল মোটামুটি অর্ধেক। ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে কিছু টাকা, মানে ‘ক্যাশ’ গচ্ছিত রাখতে হয়। দেখা যাচ্ছে এ ক্ষেত্রেও তাদের রক্ষিত ক্যাশের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। ২০১৯ সালের শেষে অতিরিক্ত ক্যাশের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার কোটি টাকার কিছু ওপরে। ২০২০ সালের শেষে অতিরিক্ত ক্যাশের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এ টাকা বিনিয়োজিত না হলে ব্যাংক হবে পরিণামে ক্ষতিগ্রস্ত। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমানতকারীরা। তাদের সুদের হার এমনিতে কম। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে উন্নত দেশের মতো সুদের হার হবে ‘শূন্য’। এমনকি ব্যাংকে টাকা রাখলে উলটো ব্যাংককে মাশুল দিতে হতে পারে। যাক, এসব নিকট ভবিষ্যতের ব্যাপার। এই মুহূর্তের জরুরি প্রশ্ন হলো কোত্থেকে এ টাকা এলো?
হঠাত্ করে এত টাকা আসেনি। ধীরে ধীরে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ স্ফীত হয়েছে। ব্যাংকগুলোতে আমানত জমা হচ্ছে। ঋণ নেওয়ার লোকের অভাব অথবা ব্যাংক অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন গ্রহণ করেছে। একটা বড় কারণ অবশ্যই সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ। সরকার প্রণোদনা প্যাকেজের মাধ্যমে বাজারে লক্ষাধিক কোটি টাকার লিক্যুইডিটি সরবরাহ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রচুর লিক্যুইডিটি ‘সাপোর্ট’ দিচ্ছে ব্যাংকগুলোকে। ব্যাংকগুলো প্রণোদনার টাকা ঋণ হিসেবে গ্রাহকদের দিচ্ছে। ব্যাংক এই টাকা কিন্তু নগদে দিচ্ছে না। ব্যাংক গ্রাহকের হিসাবে টাকা ‘ক্রেডিট’ করে দিচ্ছে ‘লোন’ হিসেবে। ঋণগ্রহীতা ঐ টাকা চেকের মাধ্যমে তুলে নিচ্ছে। তা নানা কাজে লাগাচ্ছে। আরেক অ্যাকাউন্টে জমা দিচ্ছে। এভাবে ‘ডিপোজিট’ তৈরি হচ্ছে, যাকে বলে ‘ডিরাইভেটিভ’ ডিপোজিট। আরেকটার নাম হচ্ছে ‘ক্যাশ ডিপোজিট’ অথবা ‘প্রাইমারি ডিপোজিট’। এই প্রক্রিয়ায় ব্যাংক ‘আমানত’ তৈরি করে। আমার ধারণা, বর্তমান অতিরিক্ত লিক্যুইডিটি বা অতিরিক্ত টাকা বা ফান্ডের জন্ম এভাবেই হচ্ছে। এ ছাড়া আরো কারণ আছে। নিম্নবিত্ত আমানতকারীরা ব্যাংকের জমা টাকা ভেঙে খেয়েছে বা খাচ্ছে এই ‘করোনা-১৯-এর কারণে। কিন্তু ‘হাই-নেটওয়ার্থ’ কাস্টমারদের বিষয়টি আলাদা। এসব লোকের চাকরি বহাল আছে। আয়েও বিশেষ কিছু পরিবর্তন হয়নি। যেমন—ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সরকারি কর্মকর্তা, ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায়ী, কাঁচামালের ব্যবসায়ী ইত্যাদি শ্রেণির লোকের আয় হ্রাস পায়নি। অথচ তাদের ব্যয় হ্রাস পেয়েছে। বিদেশ ভ্রমণ, দেশের ভেতরে ভ্রমণ খাতে এরা টাকা খরচ করে। হোটেল রেস্টুরেন্টে এরা যায়। সামাজিকতায় বেশ টাকা এরা খরচ করে। চিকিত্সা খাতে এদের খরচ আছে। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া খাতে খরচ আছে। দৃশ্যতই এসব খরচ এদের এখন কম করোনার জন্য। এ কারণেও তাদের ব্যাংকে গচ্ছিত টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এসব কারণে মনে হয় অতিরিক্ত তারল্যের সৃষ্টি হচ্ছে। অতিরিক্ত তারল্য ব্যাংক পর্যায়ে-ই হোক আর ব্যক্তি পর্যায়ে-ই হোক ভালো লক্ষণ নয়। অনেকের ধারণা, ব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত ‘লোনের’ টাকার সদ্ব্যবহার হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক এ কথা আকারে-ইঙ্গিতে বলেছে। কিছু টাকা শেয়ারবাজারে আবার যাচ্ছে। শেয়ারবাজারের কিছু টাকা ‘সাদা’ করা হয়েছে। এদিকে রিয়েল এস্টেট বাজারে দুটো ঘটনা ঘটেছে। সরকার চলতি বাজেটে ‘রেজিস্ট্রেস কস্ট’ হ্রাস করেছে। নামমাত্র ট্যাক্সে ফ্ল্যাট কেনার টাকাকে বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আবার সঞ্চয়পত্র আমানত, বাড়িঘর, ফ্ল্যাট, সহায়-সম্পত্তি ১০ শতাংশ কর দিয়ে ‘সাদা’ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই ক্ষেত্রে টাকার উত্স সম্পর্কে কেউ কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না। এই সুযোগে টাকার বেশ নড়াচড়া শুরু হয়েছে। অতিরিক্ত তারল্যের টাকা ঐসব খাতে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে যাবে বলে অনেকের ধারণা। শত হোক, অতিরিক্ত তারল্যের টাকা আমানতকারী ও ব্যবসায়ীদের। অবশ্য কিছু টাকা আছে ডলার প্রেরকদের। এখন কি এসব টাকা আবার রিয়েল এস্টেট এবং শেয়ারবাজারে যেতে শুরু করেছে? এটা তদন্ত করে দেখা উচিত।
শেয়ারবাজার, রিয়েল এস্টেটের বাজারে যে ‘বুদবুদ’ তৈরি প্রক্রিয়ার শিকার হবে মধ্যবিত্ত। কারণ এসব বাজার মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাবে। অতি সাম্প্রতিক কালে তা ঘটেছে। অতিরিক্ত তারল্যের জন্য শেয়ারবাজারের টাকা রিয়েল এস্টেটে যাওয়ার ফলে এসবের দাম হঠাত্ করে তিন-চার গুণ হয়ে যায়। ২-৩ হাজার টাকা বর্গফুটের ফ্ল্যাটের দাম হয়ে যায় ৭-৮-৯ হাজার টাকা। বাজার মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যায়। এসব ঘটে বিনিয়োগের কোনো ভালো সুযোগ না থাকায়। এখন ব্যাংকে টাকা রেখে যে সুদ পাওয়া যায় তা মূল্যস্ফীতির হারের নিচে। হিসাব করলে দেখা যাবে, কেউ যদি ১ কোটি টাকাও ব্যাংকে মেয়াদি আমানতে রাখে তাহলে ট্যাক্স কেটে বছরে সুদ পাবে মোটামুটি ৫ লাখের মতো। একটা গাড়ির জন্যও ড্রাইভারসহ এখন মাসে ৪০-৫০ হাজার টাকা খরচ হয়। তিন রুমের একটা ফ্ল্যাটে থাকলে ভাড়া হয় কমপক্ষে ৩০-৪০ হাজার টাকা। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে সঞ্চয়ের টাকার বরকত কী? এদিকে সঞ্চয়পত্র ক্রয়ে রয়েছে বহুবিধ বাধা। ঊর্ধ্বতম সীমা হ্রাস করা হয়েছে। সুদের হার হ্রাস পেয়েছে। কর সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অতএব এখানেও বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত। অথচ সবাই ব্যবসা-বাণিজ্য জানে না। তাহলে যাদের টাকা আছে তারা কী করবে? বাধ্য হয়ে রিয়েল এস্টেটের দিকে যাবে। কেউ কেউ সাহস করে শেয়ারবাজারেও যেতে পারে। এসবের অনিবার্য পরিণতি হবে মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, প্রণোদনার টাকা বা ঋণের টাকার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে। এ কথা আমরা বরাবরই শুনি। কিন্তু ঋণগ্রহীতারা এসব শোনেন কম। তারা অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি তৈরি করে, যে শিল্পে অভিজ্ঞতা নেই সেখানে যায়। টাকা অন্যত্র ডাইভার্ট করে। কেউ কেউ টাকা মেরে দেশত্যাগও করছে। এমতাবস্থায় যথাযথ ব্যবহার কে নিশ্চিত করবে? না করতে পারলে মূল্যস্ফীতি ঠেকানো যাবে না।
n লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
