কৈশোরে মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন

আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০২১, ২২:০৮

শৈশব পার হয়ে কৈশোর। কৈশোর মানেই প্রাণোচ্ছলতা, সজীবতা, অন্য রকম উচ্ছ্বাসের বয়স। ১০ থেকে ১৯ বছর পর্যন্ত বয়সটি হচ্ছে বয়ঃসন্ধিকাল। এই সময়েই একজন কিশোর-কিশোরীর জীবনে মানসিক, শারীরিক আচরণগত নানাবিধ পরিবর্তন ঘটে থাকে। একদিকে তারা বড় হতে থাকে, আবার শৈশবকেও পুরোপুরি ছেড়ে আসতে পারে না। সময় আবেগ বেশি থাকে এবং কিছুটা হলেও মানসিক টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত হয়।

কৈশোরবেলা মানবজীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্পর্শকাতর অধ্যায়। কিশোরারা যদি শারীরিক মানসিক সুস্থতা নিয়ে বেড়ে ওঠে, তাহলে আগামীর দক্ষ কারিগর, মানবমুক্তির দূত হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। বয়ঃসন্ধিকালে শারীরিক পরিবর্তনের ফলে কিশোর-কিশোরীদের মনে নানা প্রকার কৌতূহল, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেখা দেয় এবং মনে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। সময় কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের শরীর, চেহারা, পোশাক, আচার-আচরণ ইত্যাদি সম্বন্ধে সচেতন হয়। মানসিক পরিবর্তনগুলো প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে ঘটে থাকে।

কিশোর-কিশোরীর কতগুলো আবেগীয়, শারীরিক বা আচরণগত সমস্যা বা অস্বাভাবিকতার সমষ্টি, যা তাদের অসুস্থ এবং তার সামাজিক দৈনন্দিন জীবনের কর্মকাণ্ড কতগুলোকে ব্যাহত করে। বাংলাদেশে কোটি ৬০ লাখ কিশোর-কিশোরী আছে। তাদের মানসিক রোগ হচ্ছে আবেগগত, আচরণগত বা স্নায়বিক বিকাশজনিত। বাংলাদেশের সর্বশেষ জরিপে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা যে চিত্রটি উঠে এসেছে তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। কিশোরদের মধ্যে প্রায় ১৮. শতাংশ মানসিক রোগে ভুগছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানসিক স্বাস্থ্য হলো, শারীরিক, মানসিক, সামাজিক আত্মিক সু-অবস্থা এবং কোনো রোগ বা বৈকল্য না থাকা। সহজ কথায়, মানসিক স্বাস্থ্য হলো এমন মানসিক অবস্থা, যে অবস্থায় একজন মানুষ তার নিজেকে ক্ষমতা বুঝতে পারে, জীবনের স্বাভাবিক চাপসমূহের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে এবং তার সম্প্রদায়ের জন্য অবদান রাখতে পারে।

১৫-১৯ বছরের কিশোরীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা অনেক বেশি। ১০ থেকে ১৯ বছর সময়টি সব ধরনের সামাজিক মানবিক উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যদি এই সময় সঠিক মানসিক যত্নের অবহেলা করা হয়, তাহলে ১৫-২০ বছর পর একটি মূল্যবোধহীন সমাজ হবে। সময় কিশোর-কিশোরীর সামনে আচার-আচরণ, নৈতিকতাবর্জিত আলাপ-আলোচনা, অনৈতিক কর্মকাণ্ড নিজস্ব সমাজের অন্যান্যদের অশ্রদ্ধা, অবজ্ঞার চিত্র মনের মধ্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই সময়টাতে পড়াশোনার জন্য চাপ দেওয়া হয় ঠিকই, কিন্তু মানসিক বিকাশের জন্য কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আচরণগত, আবেগময়তার পরিবর্তনের ফলে অনেক সময় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে নিগৃহীত, নিষ্পেষিত, নিষ্ঠুরতার শিকার হলে স্বাভাবিক মানসিক বিকাশে বিঘ্ন হয়।

কিশোর-কিশোরীর বিষণ্নতা এবং উদ্বেগ দুটিই মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা। কিশোর-কিশোরীর জন্য পুষ্টিকর খাবার, মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়ানো, বিভিন্ন শারীরিক ব্যায়াম, জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় গল্পের বই পড়া, চিত্রাঙ্কন, রচনা প্রতিযোগিতা মনীষীদের জীবনী, সফল ব্যক্তির বিভিন্ন উপদেশ মূলক বাণী পড়া খুব জরুরি। কিশোর-কিশোরীদের সোনালি শৈশব বিবর্ণ হচ্ছে, পরিবারের আদি বন্ধনের ইতিহাস ঐতিহ্য ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে, তাতে সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক রীতিনীতির চর্চা, ভালোবাসা, সৌহার্দ-সম্প্রীতি আদর-মায়া-মমতা থেকে বঞ্চিত, প্রকৃতির সান্নিধ্য আসতে না পেরে কিশোর কিশোরীরা মানসিকভাবে সুস্থ-সবল, মানবিক না হয়ে পাশবিক হচ্ছে, বিপথগামিতার দিকে চলে যাচ্ছে। নেশাগ্রস্ততা, ছিনতাই-চুরি, চোরাকারবারি মাদক ব্যবসায়ী-মাদকসেবী, গ্যাং-কালচারের মতো ভয়াবহ অপরাধে জড়িছে পড়ছে।

বয়ঃসন্ধিকালে বিশেষ যত্ন এবং পারিবারিক, সামাজিক পরিবেশের মধ্য নৈতিক, মানবিক, সমধিকারের প্রতিষ্ঠা, নম্রতা, শিষ্টাচার, সুখী-সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি তথা আদর-ভালোবাসা মাখা শ্রদ্ধা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নিশ্চিত করতে পারলে প্রকৃত মানবিক মানুষ হিসেবে মানসিক সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হবে। দেশও দশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে অদূর ভবিষ্যতে, আর মানসিক স্বাভাবিক সুস্থ-সবলভাবে বেড়ে না ওঠার কারণে অকর্মণ্য বিপথগামী কিশোরটি দেশের তথা দশের জন্য সম্পদ না হয়ে জাতির বোঝা হিসেবে পরিচিতি-লাভ করবে। গঠনমূলক চিন্তার বিকাশ ঘটাতে না পারলে জাতি মেধাহীন অদক্ষ নেতৃত্বশূন্য হবে।

কিশোর-কিশোরীদের ভবিষ্যত্ উজ্জ্বল, স্বর্ণালি আলোকময় হবে, পরিমিত সুষম খাদ্যের সঙ্গে পরিমিত ঘুম-বিশ্রাম, সামাজিক-সাংস্কৃতিক চর্চা মনঃসামাজিক নৈতিক বিকাশ, ইতিবাচক চিন্তা তৈরিকরণ, সম্মানবোধ জাগরণ, কাজের যোগ্য প্রাপ্তি-পুরস্কার, পারিবারিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের ওপর কিশোর-কিশোরীর মানসিক সুরক্ষা অনেকাংশেই দায়ী। তাদের বলতে হবেতোমাকে দিয়েই হবে, তুমিই সেরা হবে, তুমিই পারবে। এক্ষেত্রে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের যথাযথ ভূমিকা পালনের বিকল্প নেই। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায়, ওয়ার্ড-ইউনিয়ন পর্যায়ে কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে, যেখানে কাউন্সেলিং কর্ণার থাকবে। কিশোর-কিশোরীর সঙ্গে তাদের অভিভাবকদের কাউন্সেলিং করাতে হবে। অভ্যন্তরীণ ক্রীড়া, নির্মল বিনোদনের ব্যবস্থাসহ সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে আত্মীয়স্বজন, পিতামাতা, গুরুজন, শিক্ষক-শিক্ষিকা, ইমাম-মুয়াজ্জিন, সমাজের নেতৃত্ববৃন্দ, প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি, বিভিন্ন ধরনের মিডিয়া। যেমন রেডিও, পত্রপত্রিকা, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র এক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে।

শুধু দেহ কিংবা শুধু মন নিয়েই মানুষ গঠিত নয়। দুটো দিয়েই মানবসত্তা গঠিত। মনের সুস্থতাই হচ্ছে দেহের সুস্থতা। কিশোর-কিশোরীরা যদি সুস্থ সবল শারীরিক মানসিকভাবে বেড়ে উঠে, তাহলে আগামী দিনে দেশ পাবে এক সুস্থ-সবল-সুন্দর জাতি।

n লেখক :প্রভাষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি ইস্পাহানী কলেজ, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা