শিশুশ্রম রোধে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২১:৩৩

নাম রনি হোসেন, বয়স ১১ কি ১২ হবে; কাজ করছে একটি হোটেলের কর্মচারী হিসেবে। ঢাকা শহরের একটি এলাকায় পরিবারের সঙ্গে বাস তার। রিকশাচালক বাবার তিন ছেলেমেয়েসহ পাঁচ সদস্যের পরিবারে সবার ছোট রনি। বড় বোন কাজ করেন গৃহকর্মী হিসেবে, আর ভাই কাজ করেন একটি দোকানে কর্মচারী হিসেবে। করোনা আসার আগে স্থানীয় এক স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছিল রনি। সবই চলছিল ঠিকঠাক। বিপত্তি বাধাল করোনা ভাইরাস। বাবার আয় একদম কমে যাওয়ায় কাজে নামতে হলো পরিবারের ছোট সদস্যটিকেও। এরই সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল স্বপ্ন গড়ার ভিত পড়াশোনা। বলা হয়ে থাকে—আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত্।  হ্যাঁ, এই স্লোগানেই বিশ্বাসী দেশের অনেক মানুষ। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এই ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব হয় না সমাজের নিম্ন আয়ের লোকদের। তাই তো নতুন বছরের শুরুতে বিদ্যালয়গুলোতে যখন কোমলমতি শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বই, ঠিক একই সময়ে পরিপূর্ণ বয়স হওয়ার আগে পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে হচ্ছে দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা হাজারো রনিকে। যে বয়সে হেসেখেলে, সব ধরনের চিন্তাহীনভাবে আনন্দে সময় কাটানোর কথা, সেই বয়সেই জীবিকার তাগিদে মাঠে নামতে হচ্ছে তাদের।

এমনিতেই শিশুশ্রমের হার অনেক বেশি আমাদের দেশে। করোনা আরো কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে এই হারকে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, কোভিড-১৯-এর কারণে নতুন আরো কয়েক লাখ শিশুকে শিশুশ্রমে ঢেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা বিগত ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হতে পারে। এই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২০০০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত শিশুশ্রম কমিয়ে আনা হয়েছে ৯ কোটির ওপরে। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে এই অর্জন আজ হুমকির মুখে।

বাংলাদেশ সরকার স্বাধীনতার পর  প্রণয়ন করে শিশু আইন (১৯৭৪) এবং গ্রহণ করা হয় শিশুনীতি (১৯৯৪)। এর পরও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরিকল্পনায় আলোচিত হয় শিশুশ্রম রোধ নিয়ে। সর্বশেষ ২০১০ সালে জাতীয় শিশুশ্রম নিরসননীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। এই নীতি বাস্তবায়ন করতে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং শিশুশ্রম নিরসন কার্যক্রম মনিটরিংয়ের জন্য গঠিত বিভিন্ন কমিটি কাজ করছে মাঠ পর্যায়ে।

এর পরও একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নিম্ন আয়ের লোকদের দুর্বলতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে কম পারিশ্রমিকে কাজে নিয়োগ দিচ্ছে শিশুদের। এতে করে কম বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির মাধ্যমে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ঠেলে দিতেও দ্বিধাবোধ করছে না। তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমাদের সমাজে শিশুশ্রমে নিযুক্ত হাজারো রনি।

শিশুশ্রমে নিযুক্ত শিশুদের গল্পগুলো হয় অনেকটা অমানবিক ও দুর্বিষহ। যেসব শিশু এসব ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিযুক্ত, তাদের অধিকাংশই দারিদ্র্যের শিকার। কোনো রকম বেঁচে থেকে জীবন যাপন করার পর্যাপ্ত সুযোগের অভাব তাদের। তাই বাবা-মা অকালেই কাজে নামিয়ে দেন আদরের সন্তানটিকে। শিশুশ্রমের অন্য আরেকটি কারণ হলো শিক্ষার অভাব। অনেক অশিক্ষিত পিতামাতা মনে করেন ছেলেমেয়েকে বেশি পড়িয়ে কী হবে! এই ধারণা থেকেই তারা তাদের সন্তানদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিযুক্ত করেন। এছাড়া সর্বস্তরে শিক্ষার সমান সুযোগের অভাব, শিক্ষার ব্যায়ভার বহনে অক্ষমতা, পিতামাতার সচেতনতার অভাবসহ বিভিন্ন কারণে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে শিশুশ্রম। করোনার এই ক্রান্তিলগ্নে অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন। পরিবারের আয় কমে যাওয়ায় এবং অধিক সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটি থাকার কারণে অনেক শিশুই শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়েছে, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়শীল একটি দেশের জন্য মোটেও কাম্য নয়।

তাই তো শিশুশ্রম রোধে প্রয়োজন সম্মিলিত কিছু পদক্ষেপের। দারিদ্র্যের কারণে যেসব শিশু বিদ্যালয়বিমুখ হয়েছে, সেসব পরিবারের দিকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। যাতে তারা নিজ সন্তানকে শিশুশ্রমে নিযুক্ত করতে দ্বিধাবোধ করে। দারিদ্র্য বিমোচনে কাজ করতে হবে। সবার জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার ব্যয় কমিয়ে আনতে হবে। নির্দিষ্ট বয়সের আগে কাজে নিযুক্ত না করার কড়াকড়ি বিধান করতে হবে। শিশুশ্রমবিষয়ক আইনের সঠিক প্রয়োগ করতে হবে।

সরকারের একার পক্ষে বিশাল এই জনসংখ্যার দেশে শিশুশ্রম নিরোধ করা অনেক কঠিন বিষয়। তাই এগিয়ে আসতে হবে দেশের সুশীল সমাজসহ সব সচেতন নাগরিককে। তবেই কমে আসবে সমাজের পুরাতন ব্যাধি শিশুশ্রম। শিশুশ্রমমুক্ত হয়ে এবং সব শিশুর প্রতিভা বিকাশের মাধ্যমে এগিয়ে যাবে দেশ—এমনটাই কাম্য।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়