আত্মসাতের ৩০ লাখ টাকা উদ্ধার করতে গিয়ে খুন হন মঙ্গল সরদার

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২২:৪০

ট্রাক কিনে দিতে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার জলিরবাজারের অটো রাইসমিল ব্যবসায়ী আলামিনকে ৩০ লাখ টাকা দেন মিষ্টি ব্যবসায়ী ক্রিটি রায়। এক পর্যায়ে আলামিন ট্রাক কিনে না দিয়ে টাকা আত্মসাত্ করেন। আত্মসাতের এ টাকা উদ্ধারের দায়িত্ব নেন ক্রিটি রায়ের ভগ্নীপতি মঙ্গল সরদার। টাকা ফেরতের চাপ দিলে আলামিন সবজি ব্যবসায়ী মঙ্গল সরদারকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ১১ সেপ্টেম্বর রাতে মুকসুদপুরের সিদ্ধিয়া বাজারে মঙ্গল সরদার, আলআমিন, কালাম, মনোজ, সবুজ, আকবর, লিটু, মুশিয়ার ও নাজমুল এক সঙ্গে চা-পান করেন। এরপর সবাই একসঙ্গে সিদ্ধিয়া বাজার হতে জলিরপাড়ের দিকে হেঁটে রওনা দেন। কুমোদ বাগচির ধানখেতের পাশে সবুজ মুখ চেপে ধরেন মঙ্গল সরদারের। অন্যরা লোহার পেরেক, লাঠি, ইট দিয়ে আঘাত করে মঙ্গল সরদারকে হত্যা করে। লাশ পাটের বস্তায় ভরে কুমোদ বাগচির হলুদ ও ধানখেতে ফেলে দেয়। পরদিন ১২ সেপ্টেম্বর মঙ্গল সরদারের লাশ উদ্ধার হয়।

চাঞ্চল্যকর ব্যবসায়ী মঙ্গল সরদার হত্যা মামলার পরিকল্পনাকারী ও ভাড়াটে খুনিসহ চক্রের সবাইকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ক্লু-লেস হত্যা মামলাটির তদন্তে নেমে পিবিআই গত ১ জানুয়ারি খাগড়াছড়ির দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে গ্রেফতার করে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া আসামি কালাম সিকাদারকে (৫২)। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী মুকসুদপুরের ভাটরা গ্রাম থেকে লিটন শেখ ওরফে লিটু (৫২), দক্ষিণ জলিরপাড় গ্রামের আকবর শেখ (৪৮) ও জলিরপাড় বাজারের মুশিয়ার শেখকে (৫৮) ও সিন্ধিয়া গ্রামের সুশান্তকে (৪৫) গ্রেফতার করে।শনাক্ত করা হয়েছে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারীকে। তবে নানামুখী চাপে হত্যাকাণ্ডের প্রধান পরিকল্পনাকারী আলামিনকে গ্রেফতার করা যাচ্ছে না। এছাড়া মামলা থেকে একাধিক আসামিকে বাদ দিতে মামলার বাদী ও নিহতের পরিবারকে চাপ দিচ্ছে একটি প্রভাবশালী চক্র।

মঙ্গলের স্ত্রী উর্মিলা সরদারের দাবি, প্রভাবশালীদের চাপে পুলিশ মূল পরিকল্পনাকারীকে গ্রেফতার করছে না। অথচ সে রাজধানীতে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

গত ১২ সেপ্টেম্বর মুকসুদপুর থানা পুলিশ মঙ্গল সরদারের বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করে। তার ভাতিজা দুলাল সরদার বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে মুকসুদপুর থানায় হত্যা মামলা করেন। টানা তিন মাস তদন্তে কূলকিনারা করতে না পারায় গত ডিসেম্বরে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে মামলাটির তদন্তভার পিবিআইকে দেওয়া হয়।

পিবিআই তদন্তে নেমে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী ও হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া আসামিদের শনাক্ত ও কয়েকজনকে গ্রেফতারে সক্ষম হয়। আসামিরা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এখন অভিযোগপত্র তৈরির কাজ করছে। অভিযোগপত্র থেকে হামলার পরিকল্পনাকারী মুকসুদপুরের ননীক্ষীর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের ভাই আলামিনসহ কয়েকজনকে বাদ দিতে চেষ্টা চালাচ্ছে প্রভাবশালী একটি গ্রুপ।

এ ব্যাপারে মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ও গোপালগঞ্জ জেলা পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী এখনো গ্রেফতার হয়নি। তবে এই হত্যার তদন্ত অনেক দূর পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে। আমরা মূল ঘটনায় থাকতে চাই। আমরা বাদীর পক্ষে নই; বিবাদীর পক্ষেও নই। ঘটনা যা তার পক্ষে। তদন্তের স্বার্থে মামলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা সঠিক হবে না।’

পিবিআইয়ের তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক জন কর্মকর্তা জানান, হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী আলামিনের ভাই স্থানীয় চেয়ারম্যান। তিনি বিষয়টিকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন। তারা তদবির করে পিবিআই প্রধানের সঙ্গে দেখা করেন। সেখানে ঐ চেয়ারম্যান দাবি করেন রাজনৈতিকভাবে তার ভাইকে ফাঁসানো হয়েছে। পিবিআই প্রধান তাকে আশ্বস্ত করেন যদি নিরপরাধ হয় তবে ছাড় পাবে।

তদন্ত সংশ্লি­ষ্ট ঐ কর্মকর্তা বলেন, আমরা গত দুই দিন ধরে ঢাকায় অভিযান চালিয়েছি। কিন্তু আলামিনকে গ্রেফতার করতে পারিনি।