সংগীত হয় বাদশা করবে না হয় ফকির

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২০:২৯

প্রায় ৪ দশক ধরে এদেশের লোকসংগীত, বাউল ও সুফিগানের সঙ্গে দিনযাপন করছেন জনপ্রিয় শিল্পী ফকির শাহাবুদ্দিন। বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের সান্নিধ্যে এসে বাউল গানে মনোনিবেশ করা এই শিল্পীর গতকাল ছিল জন্মদিন। নিজের জন্মদিনে বাউল গান ও সংগীতের নানা বিষয়ে কথা বললেন বিনোদন প্রতিদিনে সঙ্গে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন এ এম রুবেল

বর্তমান ব্যস্ততা কী নিয়ে চলছে?

বর্তমান ব্যস্ততা বলতে আমার নিজের সুর ও মিউজিকে ২২টি গানের কাজ চলছে। কাজগুলো প্রায় শেষের দিকে। এর মধ্যে একটি গান ভিডিও আকারে আসবে, বাকিগুলো অডিও। এছাড়া দীর্ঘদিন পর শো শুরু হচ্ছে। বর্তমানে সেই প্রস্তুতি চলছে।

আপনাদের গান অনেকটাই স্টেজ নির্ভর। স্টেজ পারফর্ম বা করোনাকালীন কোন ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন?

আমরা যারা মিউজিশিয়ান বা শিল্পী তারা কিন্তু কোটিপতি না। আমরা গান করেই কিন্তু জীবিকানির্বাহ করে থাকি। এই করোনাকালীন যে আমাদের কী পরিমাণ সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়েছে সেটা বলে বোঝানো যাবে। তবে আমার ব্যক্তিগত কোনো সমস্য হয়নি। আমি যতটা পেরেছি মানুষকে সাহায্য করেছি। কিন্তু আমার অন্যান্য ভাইয়েরা খুবই কষ্টে দিন পার করেছে। আর করোনার সময় ছাড়া স্বাভাবিক সময়েও আমাদের স্টেজ পারফর্ম করতে কোনো সমস্যা হয় না। আমরা আদি গান গাই, মা, মাটির গান গাই। আমাদের গান শুনলেই কিন্তু মানুষ হইহই করে ওঠে। কারণ আমাদের গানে কিন্তু এক প্রকার রক ধাঁচ রয়েছে। তবে যারা আধুনিক গান করেন তাদের মাঝে মাঝে সমস্যা হতে পারে।

আপনি দেশের প্রথমসারির একজন ফোক ও বাউলশিল্পী। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের গান চর্চা কতটা চ্যালেঞ্জের?

দেখুন, এটি একটি বিশাল আকারের প্রশ্ন। আমাদের দেশে শুধু নয়, সারাবিশ্বেই এ ধরনের গান গাওয়া বিরাট একটি চ্যালেঞ্জের বিষয়। কারণ ফোক হচ্ছে ক্ল্যাসিক্যাল গানের বাবা। বাউল গান গাইতে গেলে অবশ্যই ক্ল্যাসিক্যাল শিখতে হবে। শুরু শুনে শুনে গান গাইলে খুব অল্প সময়ে হারিয়ে যাবে। এই গানে জন্য প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে। 

নতুন প্রজন্মের জন্য এ ধরনের গানকে পেশা হিসেবে নেওয়া কতটা নিরাপদের বলে মনে করেন? তাদের আগ্রহ কেমন দেখছেন?

আমরা যখন গান গাইতে এসেছি তখন ছিল অনিরাপদ। কিন্তু এখন অনেক বেশি নিরাপদ। আমাদের সময়ে মানে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশের মৌলবাদী একটা ধারণা প্রচলিত ছিল। গান-বাজনা কম হতো। আর এখন মিডিয়া কিন্তু উন্মুক্ত। অনেকে ২/৪টা গান করেই প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের আগ্রহ অনেক বেশি লক্ষ্য করছি। কিন্তু তার পেছনে যে মানুষগুলো থাকে তাদের কারণে তারা শিল্পী হয়ে উঠতে পারে না। কারণ বাউল গান গুরু কেন্দ্রিক গান। এর জন্য গুরুকে সময় দিতে হবে। কিন্তু তারা দু-একটি গান শুনে শিল্পী বনে যাচ্ছে। কিন্তু গুরুমুখী বিদ্যা এভাবে হয় না। এটা সাধনার বিষয়। গুরুর কাছ থেকে শিখতে হবে। সংগীত দুটি জিনিস শেখায়, হয় তোমাকে বাদশা করে দেবে, না হয় ফকির।

আমাদের দেশে বাউল গানের চর্চা কম হওয়ার কারণ কী বলে মনে করেন?

বাউল গানের তো কোনো একাডেমি লাগে না। এই গানের কোনো সীমানা নেই। কেউ ক্ল্যাসিক্যাল, রবীন্দ্র, নজরুলসংগীত গায়। সেখান থেকেই ব্যান্ড, আধুনিক বা অন্যান্য গান গায়। তারপর কিন্তু বাউল গানে যায়। তাহলে তো কোনো না কোনোভাবে বাউল গানের চর্চা হলোই। বলতে পারেন, লেখাপাড়ার শেষ ডিগ্রির মতো গানের শেষ ডিগ্রি হলো বাউল গান। ক্ল্যাসিক্যাল চর্চা করলেই ফোক বা বাউল গানের চর্চা হয়ে যায়। ফোক হচ্ছে ক্ল্যাসিক্যাল গানের জনক।   

অডিও ক্যাসেটের যুগ থেকে বর্তমান সময়ের ইন্ডাস্ট্রিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

অডিও ক্যাসেটের যুগ এখনো থাকলে বাংলা গানের অধঃপতন আরো হতো। কারণ তখন কোনো শিল্পী তৈরি হতো না। তখন আসল শিল্পীরা সুযোগ পেতো না। তখন যার পরিচিত থাকতো সে গানের সুযোগ পেতো। কিন্তু এখন উন্মুক্ত যুগে প্রকৃত শিল্পীরা উঠে আসছে। অডিও দিয়ে কখনো শিল্পীর বিচার করা যায় না, ওটা কোনো মাধ্যমই না। বলতে পারে ওই যুগটা ছিল বাংলা সংগীতের অন্ধকার যুগ।