শৈশবকাল হইতে এই কথা আমরা সকলেই শুনিয়া আসিতেছি—অপচয় করিও না, অভাব হইবে না। অপচয় ও অপব্যয় যে এক ধরনের অবক্ষয় ডাকিয়া আনে, তাহা আমরা অনেক ক্ষেত্রেই বুঝিতে পারি না। ধর্মেও অপচয় ও অপব্যয় ঠারেঠোরে নিষিদ্ধ। কোনো কাজ বৈধ হইলেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয় করাটাকে ইসরাফ বা অপচয় হিসাবেই দেখা হয়। তবে অপচয় ও অপব্যয় বহু ক্ষেত্রেই আমাদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচায়ক। অপচয়ের সহিত কোনো কোনো ক্ষেত্রে অহংকারেরও সম্পর্ক দেখা যায়। অর্থের সংস্থান থাকা মানেই পরিমিতিবোধ নষ্ট করা নহে। অথচ রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে এই পরিমিতিবোধের অভাব দেখা যায় ছত্রে ছত্রে। যেমন—এইবারে জনশুমারি শুরুর পূর্বে খানাপ্রধানের তালিকা করা হইবে কি না—তাহা লইয়া কিছুদিন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো তথা বিবিএসে তুলকালাম চলিয়াছে। শেষ পর্যন্ত তাহা বাতিল করা হইয়াছে। কিন্তু ততক্ষণে এই কাজের জন্য প্রায় ৩২ কোটি টাকার উপকরণ ক্রয় করা হইয়া গিয়াছে। বিবিএসের নথিপত্রে দেখা যায়, ৪ কোটি খানাপ্রধানের তথ্য সংগ্রহের জন্য লিস্টিং বা তালিকাভুক্তি ফরম ছাপানো হইয়াছিল। এই ফরম কীভাবে ব্যবহার করা হইবে, সেই জন্যও ছাপানো হইয়াছিল লিস্টিং ম্যানুয়াল। এই জন্য খরচ হইয়াছে ১০ কোটি টাকা। খানাপ্রধানের তালিকা তৈরির ফরম পূরণ করিবার জন্য ১১ কোটি টাকার কলম, প্রচারণার জন্য ৭ কোটি টাকার স্টিকার ক্রয় এবং ৪ কোটি টাকার নোটবুক ক্রয় করা হইয়াছে। সকল মিলাইয়া খানাপ্রধানের তালিকা করা বাবদ ৩২ কোটি টাকা খরচ করা হইয়া গিয়াছে। অথচ জনশুমারি শুরুর পূর্বে খানাপ্রধানের তালিকা করিবার অংশটি বাতিল করা হইয়াছে।
বলিবার অপেক্ষা রাখে না, এই সকল উপকরণ এখন সম্পূর্ণই অচল। কারণ, উপকরণগুলি জনশুমারির বাহিরে অন্য কোথাও আর ব্যবহারের সুযোগ নাই। এখন এই সকল উপকরণ কেজি দরে বিক্রয় করিয়া দেওয়া কিংবা পুড়িয়া ফেলা অথবা ফেলিয়া দেওয়া ছাড়া আর কিছু করিবার নাই। এই ক্ষেত্রে আবার প্রক্রিয়াগত জটিলতা ও বাড়তি খরচের ব্যাপার রহিয়াছে। অর্থাত্ ভাবিতে ভাবিতেই ৩২ কোটি টাকা অপচয় হইয়া গেল! কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ মনে করেন—স্বাধীনতার পর গত অর্ধশতকে রাষ্ট্রীয় অর্থ ও সম্পদের যত অপচয় হইয়াছে, তাহা দিয়া বাংলাদেশের সমান আরো দুইটি দেশ গড়িয়া তোলা সম্ভব। ইহা একটি তত্ত্বীয় হিসাব হইলেও অপচয় ও অপব্যয় যে আমাদের বিপুল পরিমাণে হয়, তাহা লইয়া কোনো সংশয় নাই। এই জন্য বলা হইয়া থাকে—সরকারি মাল দরিয়া মে ঢাল। সরকারি জিনিসের ব্যাপারে এই ধরনের প্রবাদ ও মনস্তত্ত্ব অপচয়ের দৃষ্টিভঙ্গি হইতেই আসিয়াছে। আমরা দেখিয়াছি, সরকারি, আধাসরকারি অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতি মুহূর্তে বিবিধ ধরনের অপচয় ও অপব্যয় হইতেছে। প্রতিদিন তাহার সার্বিক মূল্য যোগ করিলে দাঁড়াইবে শত শত কোটি টাকা। সরকারি অফিসে বিদ্যুতের অপচয় অতি সাধারণ বিষয়। প্রায়শই দেখা যায়, সন্ধ্যার পর হইতে সারা রাত কোনো কোনো অফিসে অনাবশ্যক বাতি জ্বলে। অন্যদিকে প্রায় ৮০ শতাংশ সরকারি অফিসের টয়লেট নোংরা এবং কল নষ্ট। দেখা যাইবে যে, পানির কল হইতে অনবরত পানি ঝরিতেছে। গ্যালন গ্যালন পানির অপচয় হইতেছে প্রতিদিন। এইভাবে পানির অপচয়, বিদ্যুতের অপচয়, প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয়ে অফিসের আসবাব ও তৈজস ক্রয়ের ভিতর দিয়াও আমরা আমাদের সম্পদকে নষ্ট করিতেছি।
মনে হইতে পারে, এই সকল অপচয় বিন্দু বিন্দুবত্। কিন্তু বিন্দু বিন্দু হইতেই অপচয়ের পাহাড় সিন্ধুসমান হইয়া যায়। সুতরাং অপচয় এবং অপব্যয়ের এই মনস্তত্ত্ব হইতে আমাদের বাহির হইয়া আসিতেই হইবে।
