পল্লি সড়কে সেতু নির্মাণ প্রকল্পে যাদের গাফিলতির কারণে অর্থ ও সময়ের অপচয় হয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পর তাকে অবহিত করতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। গতকাল বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, প্রকল্প পরিচালকেরা ঢাকায় বসে থাকেন। তারা প্রকল্প এলাকায় অবস্থান করেন না, এটা সহ্য করা হবে না। এ বিষয়েও যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন তিনি।
গতকাল বুধবার গণভবন থেকে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে প্রধানমন্ত্রী ও একনেকের চেয়ারপারসন শেখ হাসিনা একনেক সভায় সভাপতিত্ব করেন। শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত সভা শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন তুলে ধরেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। মন্ত্রী বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দেখা যায়, সংশোধনের সময় দুই-একটি নতুন আইটেম চলে আসে, যার জন্য প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যায়। প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্ন হলো, যখন প্রকল্প তৈরি করা হলো, তখন এগুলো কেন দেখা হয়নি। গতকাল পল্লি সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ প্রকল্পটির প্রথম সংশোধনী অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ৩ হাজার ৯২৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকার প্রকল্পটির ব্যয় গতকাল ২ হাজার ৫৩০ কোটি ৪৩ লাখ টাকা বাড়িয়ে ৬ হাজার ৪৫৭ কোটি ১৯ লাখ টাকায় অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যারা প্রকল্পের পরিকল্পনা করেন, তারা সবকিছু আগে কেন দেখেন না। যাদের গাফলতিতে সময় বাড়ল, ব্যয় বাড়ল, অর্থের অপচয় হলো, তাদের চিহ্নিত করুন। তাদের বিরুদ্ধে আপনারা আইনানুগ, বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নিন। ভবিষ্যতে যাতে এরকম না হয়, আপনারা যার যার অবস্থান থেকে সাবধান হয়ে যান। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কোনো দায় আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘হ্যাঁ, অস্বীকার করছি না। এটা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, খোঁজ নিয়ে বের করুন কাদের দায়ে এই অবস্থা হলো। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। সেই সঙ্গে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তাকে অবহিত করতে বলেছেন।
উল্লেখ্য, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময়ও বেড়েছে। এটি ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের জুন মেয়াদে বাস্তবায়ন করার কথা ছিল। সংশোধনীতে প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন তুলে ধরে পরিকল্পনামন্ত্রী আরো জানান, প্রধানমন্ত্রী আগেও বলেছেন এবারও বলেছেন প্রকল্প পরিচালকদের (পিডি) প্রকল্প এলাকায় অবস্থান করতে। পিডিরা ঢাকায় বসে থাকেন, এটা সহ্য করা হবে না। এরকম পিডিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাছাড়া শুধু বড় ঠিকাদারেরা যাতে কাজ না পান, ছোট ছোট ঠিকাদারেরাও যাতে কাজে অংশ নিতে পারেন, সে জন্য ব্যবস্থা নিতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।
গতকাল এককেন সভায় আটটি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুটি সংশোধিত আকারে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন (জিওবি) ৫ হাজার ১৪০ কোটি টাকা, বৈদেশিক উত্স থেকে ঋণ ৬ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ১৮ কোটি টাকা।
সভায় ঢাকা পরিবেশবান্ধব টেকসই পানি সরবরাহ প্রকল্পের প্রথম সংশোধনী অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় বেড়েছে ২ হাজার ৯০৩ কোটি টাকা। ৫ হাজার ২৪৮ কোটি টাকার প্রকল্পটি ব্যয় বেড়ে হয়েছে ৮ হাজার ১৫১ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার লক্ষ্য থাকলেও এখন ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। প্রকল্পটিতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), এএফডি ও ইআইবি থেকে ৫ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা ঋণ পাওয়া যাবে। সভায় ১০৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ব্যয়ে যানবাহন চালনা প্রশিক্ষণ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় আটটি বিভাগের ৪০টি জেলায় দক্ষ গাড়িচালক তৈরি করতে ৪০ হাজার যুবককে প্রশিক্ষণ দেবে।
সভায় অনুমোদিত অন্য প্রকল্পগুলো হলো—২৭২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ে টাঙ্গাইল জেলার ১০টি পৌরসভার অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, ৪২৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকা ব্যয়ে তৃণমূল পর্যায়ে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে নারী উদ্যোক্তাদের বিকাশ সাধন প্রকল্প, ৩৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ডিজিটাল উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবন ইকো-সিস্টেম উন্নয়ন প্রকল্প, ৪ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর উন্নয়ন প্রকল্প।
সভায় জানানো হয়, ডিজিটাল উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবন ইকো-সিস্টেম উন্নয়ন প্রকল্পটির মাধ্যমে জনতা টাওয়ারের পার্শ্ববর্তী জায়গায় একটি দৃষ্টিনন্দন, পরিবেশবান্ধব সফটওয়্যার পার্ক (জনতা টাওয়ার সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক-২) গড়ে তোলা হবে। দেশের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনোভেশন হাব তৈরি হবে। এছাড়া চারটি ল্যাব তৈরি করা হবে।
