বইগুলো বুকের সাথে লেপটে ধরে ছোট ছোট পা ফেলে হেঁটে যাচ্ছে বেলি। ও স্কুলে যাচ্ছে। ওদের বাড়ির সামনের গলিটা পার হলেই প্রাইমারি স্কুল। রোজ স্কুলে যায় বেলি। স্কুলে যেতে ওর খুব ভালো লাগে। কিন্তু বাবা-মা তিন বছরের ছোট বেলিকে স্কুলে পাঠাতে চায় না। তাই একা একাই ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠে বেলি। সে দ্রুত হাত-মুখ ধুয়ে নাস্তা করে স্কুলে যায়। বেলি রোজ সবার আগে স্কুলে পৌঁছায়।
দেরি হলে সে প্রথম বেঞ্চে বসতে পারবে না। এই জন্য সে তাড়াতাড়ি স্কুলে আসে। প্রথম বেঞ্চে বসতে ওর খুব ভালো লাগে। তবে মাঝে মাঝে বেলির মনটা খারাপ হয়ে যায়। কারণ ওকে প্রথম বেঞ্চ থেকে পেছনে পাঠানো হয়। তখন ওর খুব কান্না পায়। চোখের পানি ঝরঝর করে ঝরে। বাবা-মায়ের ওপর খুব অভিমান হয়। বাবা-মা তাকে স্কুলে ভর্তি করে দিলে আর কেউ তাকে পেছনে পাঠাতে পারত না। অথচ বাবা-মা কিছুতেই স্কুলে ভর্তি করে দেয় না।
বেলি প্রতিদিন স্কুলের পড়া তৈরি করে, কিন্তু কোনো শিক্ষক তাকে পড়া জিজ্ঞেস করেন না। অথচ ক্লাসে কেউই যখন পড়া দিতে পারে না তখন বেলি ঠিকঠাক উত্তর দেয়। সব শিক্ষকরা ওকে ভালোবাসেন।
ক্লাসের সবার রোল আছে। শুধু বেলির কোনো রোল নেই। এসব ভেবে তার খুব মন খারাপ হয়। বরুয়া ম্যাডাম সেদিন বলছিলেন পরীক্ষায় পাস করলে রোল হয়। বেলি তাই এখন বেশি বেশি পড়ালেখা করে। তাকে যে পরীক্ষায় পাস করতে হবে!
বেলির মা স্কুল ছুটির আগে স্কুল গেটের কাছে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। মা ওকে বলে, তুমি আরেকটু বড়ো হলেই স্কুলে আসবে। তুমি এখন অনেক ছোট তাই তোমাকে স্কুলে ভর্তি করা যাবে না। কিন্তু বেলি কিছুতেই স্কুলে আসা বন্ধ করে না। বরং ওকে স্কুলে যেতে বাধা দিলে খুব কান্না করে। মেয়ের কচি মনটা ব্যথা পাবে ভেবে তাই আর বাধা দেয় না বেলির বাবা-মা।
বেলি রাতে ঘুমালে স্বপ্ন দেখে। স্কুলটা একটা ফুলের বাগান আর বাগান জুড়ে অনেকগুলো পরি। লাল পরি-নীল পরি-হলুদ পরি-গোলাপি পরি...। পরিদের পেছনে ডানা। পরিরা বাগানে উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়ায় আর খেলা করে। একসময় পরিরা বেলির সাথে খেলা করে। বেলিরও পরির মতো সুন্দর পাখা গজায়। সে পরিদের সাথে উড়ে উড়ে বেড়ায়। কত মজা করে!
ঘুম থেকে উঠে খুব খুশি হয় বেলি। নিজেকে পরি মনে হয়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পেছনের পাখা খোঁজে। মিষ্টি একটা হাসি ফুটে ওঠে ওর মুখে।
তবে স্কুলে ওকে সবাই অবহেলা করে ভেবে হাসিটা মিলিয়ে যায়। এইতো কিছুদিন আগে স্কুলে খেলাধুলা হলো। সবাই অংশ নিল। বিস্কুট দৌড়, অক্ষর মেলানো, রঙিন বল মেলানো, অঙ্ক কষা আরো কত কি! সবার মতো বেলিও খেলায় অংশ নিতে চাইল, কিন্তু কেউ ওকে খেলায় নিল না। শিক্ষকরা বললেন, ‘তুমি আগে স্কুলে ভর্তি হও তারপর খেলায় অংশ নিতে পারবে।’ বেলির মনটা অভিমানে ভরে গেল। মাঠের এককোণে বসে সেদিন খুব কেঁদেছিল সে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল। গোলগাল মুখটা লাল হয়ে গিয়েছিল। সবাই খেলছে আর সে একা দূরে বসে আছে। নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হয়েছিল ওর।
দেখতে দেখতে বছর শেষ হয়ে যায়। স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হয়। বেলিও সবার মতো পরীক্ষা দিতে স্কুলে যায়। সে যথারীতি বেঞ্চে বসে প্রশ্নের অপেক্ষা করে। কিন্তু শিক্ষক সবাইকে প্রশ্নপত্র দিলেও বেলিকে দেন না। বেলির মায়াবী দুটো চোখ ফেটে কান্না আসে। কান্না দেখে হেড স্যার ওকে বলেন, ‘তোমার আম্মুকে ডেকে আনো।’
বেলি দৌড়ে মায়ের কাছে আসে। তাকে জোর করে স্কুলে নিয়ে যায়। হেড স্যার বেলির মাকে বলেন, ‘বেলি পরীক্ষা দেবেই। ওর স্কুলে ভর্তির বয়স হয়নি। তবুও আমি ওকে নিজ দায়িত্বে স্কুলে ভর্তি করে নিচ্ছি।’
স্যারের কথা শুনে খুশিতে নাচতে শুরু করে বেলি। পরীক্ষা দিতে পেরে খুব খুশি সে।
পরীক্ষা শেষে সবার মতো বেলিও পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষা করতে থাকে। সে খুব উত্তেজিত পরীক্ষার রেজাল্ট নিয়ে।
নতুন বছরের প্রথমদিন পরীক্ষার রেজাল্ট দেবে। সবার মতো বেলিও দুরুদুরু বুকে স্কুলে যায়। হেড স্যার রেজাল্ট ঘোষণা করেন।
ক্লাসে প্রথম হয়েছে বেলি। রেজাল্ট শুনে খুশিতে লাফিয়ে ওঠে সে। আনন্দে জড়িয়ে ধরে মাকে। বেলির রেজাল্টে সবাই খুব খুশি। বাবা-মা-শিক্ষক সবাই বেলিকে নিয়ে গর্ব করে। আদর করে। সবার আদর পেয়ে বেলির নিজেকে পরি মনে হয়। মজার স্কুলের পরি।
