রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতিসহ প্রতিটা ক্ষেত্রে নতুন নতুন চিন্তাভাবনা ও তত্ত্ব ছাড়া একটা জাতি সামনে যেতে পারে না। আর এসব নতুন তত্ত্ব ও ধারণা লাভ করা সম্ভব হয় গবেষণার মাধ্যমে। যে কোনো ব্যক্তি তাঁর নিজের দক্ষতা অনুযায়ী বিষয় নিয়ে গবেষণা করে সেসব পত্রিকা, বই বা অন্যান্য মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারেন। তবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সারা পৃথিবীতে গবেষণা কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে। অনেকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় মানেই গবেষণা। শুধু মুখস্থবিদ্যার মাধ্যমে সনদপত্র দিয়ে ডিগ্রিধারী সৃষ্টি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য হতে পারে না।
পৃথিবীর সেরা ৮০০-র মধ্যেও বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই। গবেষণা কার্যক্রমের চরম অভাবও এই তালিকায় নাম না থাকার প্রধান কারণ। অথচ প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম সারা পৃথিবীতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এখানকার শিক্ষক সত্যেন্দ্রনাথ বসু ১৯২৪ সালে আলবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে যৌথভাবে বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান প্রদান করেন, যা পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার বলে বিবেচিত। বসু-আইনস্টাইন পরিসংখ্যানের মাধ্যমে পূর্ণ সাংখ্যিক স্পিন বিশিষ্ট মৌলিক কণার পরিসাংখ্যিক বণ্টন ব্যাখ্যা করা যায়। যেসব কণা এই পরিসংখ্যান মেনে চলে তাদেরকে বসুর নাম অনুসারে ‘বোসন’ নামে অভিহিত করা হয়।
একটা নব্য প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকের আইনস্টাইনের মতো পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ পদার্থবিজ্ঞানীর সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা সারা পৃথিবীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরব বাড়িয়েছিল, যদিও পরে এই ধারা অব্যাহত থাকেনি।
উন্নত দেশগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক গবেষণা বৈজ্ঞানিক, চিকিত্সা, প্রকৌশল ও অন্যান্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এক্ষেত্রে সরকারির মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর সেরা ২০-এর তালিকায় সবসময়ই আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থাকে। এর মধ্যে প্রায় প্রতিবছরই প্রথম স্থানে থাকা এমআইটি, হার্ভার্ড, ইয়েল প্রিন্সটন এবং স্ট্যানফার্ডসহ আরো কয়েকটা হচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। অথচ বাংলাদেশে গণ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোতেও গবেষণা কার্যক্রম শোচনীয়। শুধু সনদপত্র দেওয়াকেই তাদের মূল দায়িত্ব মনে করে। গবেষণা কার্যক্রম সেখানে একটা অপ্রয়োজনীয় ও হাস্যকর বস্তু। একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্র নিয়ে পড়ার সময় ব্যক্তিগত উদ্যোগে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে কোনো পৃষ্ঠপোষকতার পরিবর্তে উলটো নিন্দিত হয়েছিলাম। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রেও পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয় যে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বা অলাইন পিএইচডি গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্নভাবে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হতে পারে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একজন শিক্ষকের নেতৃত্বে ছাত্ররা বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রমে অংশ নেয়। তবে পৃথিবীর প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার মূল ক্ষেত্র হচ্ছে পিএইচডি। ইউরোপ-আমেরিকা এমনকি এশিয়ার মালয়েশিয়াতেও স্নাতক শেষে একজন শিক্ষার্থী পিএইচডির জন্য আবেদন করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে সম্পূর্ণ অর্থহীনভাবে মাস্টার্সের পর পিএইচডি করতে হলে এমফিল করতে হবে—এরকম একটা নিয়ম চালু রাখা হয়েছে। এটা দেশে পিএইচডি গবেষকের সংখ্যা কম হওয়ার অন্যতম কারণ। গবেষণার সুযোগ-সুবিধা ও পৃষ্ঠপোষকতা সীমিত। অন্যদিকে আবার গবেষক নামধারী কিছু ব্যক্তি বিরল এ সুবিধা লাভের পরও দুর্নীতির আশ্রয় নিচ্ছেন! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নকলের অভিযোগে দুজন পিএইচডি গবেষককে শাস্তি দিয়েছেন।
গবেষণা কার্যক্রম প্রসারের জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এগুলি হচ্ছে: সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা কার্যক্রম বাধ্যতামূলক করা, গবেষণায় ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানো, দেশের জন্য উপযোগী বিষয়গুলোকে গবেষণার জন্য নির্বাচন করে দেওয়া, এমফিল প্রথা বাতিল করে স্নাতকের পর পিএইচডি করার সুযোগ দেওয়া, গবেষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও সুপারিশের পরিবর্তে মেধা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া। এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে গবেষণা কার্যক্রম গতিশীল ও কার্যকর হবে, যা দেশের সার্বিক উন্নয়নে অবদান রাখবে বলে আশা করা যায়।
ঢাকা
