বর্তমান বিশ্বে যতগুলো গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম একটা গৃহযুদ্ধের নাম ইয়েমেন সংকট। ইয়েমেন যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ১০ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে। যার ফলে জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিক দিয়ে শীর্ষ স্থানে রয়েছে ইয়েমেন। এখন প্রশ্ন হলো কীভাবে শুরু হয় এই গৃহযুদ্ধ? আসলে ইয়ামেন সংকট শুরু হয় আরব বসন্তের কারণে। যার ফলে ইয়েমেনের দীর্ঘকালের প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালে বিক্ষোভের মুখে ২০১১ সালে আব্দুরাব্বু মুনসুর হাদির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। আর এই ক্ষমতা হস্তান্তর করার পর ইয়ামেনের জঙ্গিরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। আর শিয়া ধর্মাবলম্বী হুতি বিদ্রোহ তো ছিলই। যার ফলে ইয়ামেনে এক অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ফলে নতুন প্রেসিডেন্ট কিছু বুঝে ওঠার আগেই ইয়েমেনের সাদা প্রদেশ এবং আশপাশের এলাকা দখল করে নেয় হুতিরা।
ইয়েমেন সংকট গভীর আকার ধারণ করে যখন তাদের সমর্থন প্রদান করেন ইরান। যার ফলে অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে আরব বিশ্বের আটটি সুন্নিপ্রধান দেশ মিলিত হয়ে একটা জোট গঠন করে। যারা নতুন প্রেসিডেন্ট হাদির পক্ষে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। আর সৌদির এই জোটকে পেছন থেকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স সহায়তা প্রদান করে। যার ফলে ইয়ামিনের সংকট ভয়াবহ রূপ ধারণ করে এবং ২০১৭ সালে সালেহ এবং হুতিদের মধ্যে সম্পর্ক ভেঙে যায়। আর এই সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো সানার একটি মসজিদকে দখল নেওয়া। এবং হুতিরা সালেহকে হত্যা করে। আর ইয়েমেনের এই নাজুক পরিস্থিতির সময় সেখানে আলকায়েদা এবং আইএস-এর মতো জঙ্গি সংগঠনগুলো ঘাঁটি গড়ে এবং সেখান থেকে পশ্চিমা বিশ্বে হামলা পরিচালনা করার নীলনকশা তৈরি করে। যার ফলে ইয়েমেনের যুদ্ধ পশ্চিমা বিশ্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা দেয়। আর এমন পরিস্থিতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র সরবরাহ করে। সৌদি আরব এসব অস্ত্র বিদ্রোহ দমনে ব্যবহার করে। নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন গত ২০ জানুয়ারি শপথ গ্রহণ করার পর থেকেই বেশ কিছু নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন। যার মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবের সঙ্গে অস্ত্রচুক্তি নিষেধাজ্ঞা। আর নিষেধাজ্ঞার পরোক্ষ কারণ হিসেবে বলা যায় যে বাইডেন প্রশাসন ইয়েমেন অভিযানে সৌদি জোটকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করবে। বাইডেন আরো বলেন যে, আরব উপদ্বীপে আলকায়েদার বিরুদ্ধে চলমান অভিযানকে এই সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করবে না। ইতিমধ্যে সুইডেন প্রশাসন সৌদি আরবকে সমর্থন দেওয়া বন্ধও করেছে।
জাতিসংঘের ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়ামেনে ৮০ ভাগ মানুষের সহায়তা সুরক্ষা প্রয়োজন। যার ফলে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো ইয়ামেনে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দিয়েছে। এখন কথা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের এই সমর্থন বন্ধের ফলে কি ইয়েমেনের যুদ্ধ বন্ধ হবে? হবে না তবে রিয়াদ এবং আবুধাবি নেতাদের কাছে একটা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রদান করছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে বাইডেনের এই সমর্থনের মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে পরমাণু সমঝোতা চুক্তি ফিরে আসা। কারণ, ট্রাম শাসনামলে ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র বের হয়ে যায় এবং সৌদির দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে। যার ফলে মধ্যপ্রাচ্য নতুন এক সংঘাতের দিকে এগিয়ে যায়। আর বাইডেন এই সংঘাত নির্মূল করার জন্য কি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে? এরকম হাজারো প্রশ্ন সামনে চলে আসছে। নতুন রাষ্ট্রদূতের কাজ হবে ইয়েমেনের যুদ্ধ থামানো এবং আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব নিরসনের চেষ্টা করা। এখন দেখার বিষয় হচ্ছে, বাইডেন তার কাজে কতটা সফলতা অর্জন করতে পারেন।
সর্বশেষে বলা যায় যে, ইয়েমেনকে নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বদের এত আগ্রহ কেন? আর এই আগ্রহের অন্যতম কারণ হলো ইয়েমেনের ভৌগোলিক অবস্থান। ইয়েমেন লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মাঝখানে অবস্থিত। আর এইখান দিয়ে দেশের সিংহভাগ তেলবাহী জাহাজ চলাচল করে। তাই এই অঞ্চল যার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তার পক্ষে তেল সম্পদের ওপর খবরদারি করা সহজ হবে। আর বলা যায়, বর্তমানে বাইডেন যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা তিনি কতটা কার্যকর করতে পারবেন—সেটাই দেখার বিষয়। কারণ, আমেরিকার অর্থনীতির অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো অস্ত্র বিক্রি করা। এছাড়া আমেরিকা সৌদি আরবের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে এই সম্পর্কের অবনতি ঘটবে কি না, আমেরিকার অর্থনীতিতে প্রভাব পড়বে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়; যেখানে আমেরিকার প্রধান অস্ত্র ক্রেতা সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।
n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
