জাল নথি দিয়ে হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি দখলের চেষ্টা

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২২:৪২

পরিচয় দিয়েছিলেন বীরেশ চন্দ্র সাহার সন্তান হিসাবে। দাখিল করেছিলেন জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মসনদ ও সিটি করপোরেশনের নাগরিক সনদপত্র। সৃজনকৃত এসব জাল কাগজপত্র দিয়েই সাভারের গান্ধারীয়া মৌজার কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি অবমুক্তির রায় হাসিল করে নেয় এক জালিয়াত চক্র। ভয়াবহ এই জালিয়াতির ঘটনাটি ধরা পড়েছে উচ্চ আদালতে। জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে হাসিল করা ট্রাইব্যুনালের দেওয়া সম্পত্তি অবমুক্তির দুটি রায় বাতিল করে দিয়েছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে জালিয়াত চক্রের হোতা মাধব চন্দ্র সাহাকে ১ কোটি টাকা জরিমানাও করা হয়েছে।

হাইকোর্ট বলেছে, আবেদনকারীদ্বয় (মাধব ও রোহী) বীরেশ চন্দ্র সাহা পোদ্দারের সন্তান হলে বাবা-মায়ের সঙ্গে তাদের পারিবারিক ছবি আদালতে দাখিল করতেন। বাবা-মায়ের নামের ভোটার তালিকা উপস্থাপন করতেন। বাবা-মা কবে মারা গেছেন, কোথায় দাহ করা হয়েছে বলতে পারতেন। তাদের অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের নাম, ঠিকানা বলতে পারতেন। নথি পর্যালোচনায় এটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে আবেদনকারীদ্বয় বীরেশ চন্দ্র সাহা পোদ্দারের সন্তান হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। ট্রাইব্যুনালে মামলাকারী যে প্রকৃতপক্ষে ভুয়া এবং জালিয়াতকারী তা দিনের আলোর মতো প্রমাণিত সত্য। এমনকি মাধব চন্দ্র মূল মামলার হলফনামায় যেসব তথ্য দিয়েছেন তা আদালতের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। জাল কাগজ দাখিল করে এরা আদালতের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। এই জালিয়াত ও প্রতারক চক্র জাতির শত্রু। বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। গত বছর দেওয়া এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে।

এদিকে নথিপত্র সঠিকভাবে যাচাই না করে কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি অবমুক্তির রায় জালিয়াত চক্রের অনুকূলে দেওয়ায় অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ এবং আপিল ট্রাইব্যুনালের বিচারকের সমালোচনা করেছে হাইকোর্ট। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছে, এটা স্বতঃসিদ্ধ যে কোনো মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার কারণসমূহ যথেষ্ট যুক্তিসম্পন্ন হতে হবে। যুক্তিহীন রায় বিচার বিভাগকে জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করে। জনমনে আস্থাহীনতার সৃষ্টি করে। আর বিচারকের প্রজ্ঞা ও সততা ছাড়া মানসম্মত বিচারব্যবস্থা কল্পনা করা যায় না।

আদালত বলেছে, মাধব ও রোহী চন্দ্র সাহা নিজেদেরকে ক্ষেত্র মোহনের নাতি ও বীরেশ চন্দ্র সাহার সন্তান দাবি করে মূল মালিকের উত্তরাধিকারী হিসাবে সম্পত্তি ফেরত পেতে মামলা করেন। কিন্তু এদের মালিকানার বিষয়টি যাচাইয়ের সুযোগ ছিল ট্রাইব্যুনালের। কিন্তু সেটা না করে শুধু জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মসনদ ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের নাগরিকত্ব সনদ বিবেচনা করে কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি জালিয়াত চক্রকে দিয়ে দেন তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

রায়ের কপি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানোর নির্দেশ :হাইকোর্ট বলেছে, বিচারকদের বিশাল গুরুদায়িত্ব হলো জনগণের সম্পত্তি যেন জোচ্চর, ঠগ, বাটপার এবং জালিয়াত চক্র গ্রাস করতে না পারে। সেজন্য রায়ের এই অনুলিপি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণের জন্য প্রেরণ করতে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে নির্দেশ দেওয়া হলো। যাতে প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগত উদ্যোগে নালিশি অর্পিত সম্পত্তিসহ লাখ লাখ কোটি টাকার রাষ্ট্র তথা জনগণের সম্পত্তি লুটেরা বাহিনীর হাত হতে রক্ষা করতে যথাযথ উদ্যোগ নিতে পারেন।

যেভাবে জালিয়াতি :ঢাকা জেলার সাভারের গান্ধারীয়া মৌজার ১৫ দশমিক ৭৪ একর ভূমির মালিক বীরেশ চন্দ্র সাহা পোদ্দার। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তিনি ভারতে চলে যান। ফলে নালিশি সম্পত্তি সেনসাস লিস্ট অনুযায়ী শত্রু সম্পত্তি হিসাবে তালিকাভুক্ত হয়। পরবর্তীকালে নালিশি সম্পত্তিকে অর্পিত সম্পত্তি তথা ভেস্টেড প্রপার্টি (ভি.পি) তালিকাভুক্ত হয়। দীর্ঘ ৪৭ বছর পর ২০১২ সালে মাধব চন্দ্র সাহা পোদ্দার ও রোহী চন্দ্র সাহা সংশ্লিষ্ট মৌজার ১ হাজার ৫৫৬ শতাংশ সম্পত্তির মালিকানা দাবি করেন এবং প্রকাশিত গেজেটে ‘ক’ তপশিলভুক্ত অর্পিত সম্পত্তির তালিকা হতে অবমুক্তির জন্য ঢাকার অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ ট্রাইব্যুনালে মামলা (মামলা নম্বর :৪৭৯/২০১২) দায়ের করেন। ২০১৬ সালে ২৫ অক্টোবর সাভারের সিনিয়র সহকারী জজ আদালত এক রায়ে বাদীপক্ষের আবেদন মঞ্জুর করেন। নালিশি সম্পত্তি অবমুক্তির আদেশ দেন। এই রায় ও ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিল (আপিল নম্বর :২০/২০১৭) করেন ঢাকার জেলা প্রশাসক। অর্পিত সম্পত্তি আপিল ট্রাইব্যুনাল এবং ঢাকার জেলা জজ ২০১৭ সালের ২ নভেম্বর আপিল খারিজ করে সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের রায় বহাল রাখে। পরে এই রায়ের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন সাভার থানা অসহায় পরিবার পুনর্বাসন বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড। ঐ রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট রুল জারি করে। ঐ রুলের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে গত বছর হাইকোর্ট ট্রাইব্যুনালের দুটি রায় বাতিল করে দেয়।